10th Jul 2008

গ্যাটকো মামলাঃ আদালতে খালেদা জিয়াঃ নিজামীর জামিন আবেদন নামঞ্জুর

আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব
নিজস্ব প্রতিবেদক:
কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, সরকারের সাথে তার কোনো সমঝোতা হয়নি, বিএনপি আপসে বিশ্বাস করে না। গতকাল সংসদ ভবনের বিশেষ আদালত ৩-এ গ্যাটকো দুর্নীতি মামলার শুনানি শেষে বেগম খালেদা জিয়া সাংবাদিক ও আইনজীবীদের এ কথা বলেন। এ দিকে গতকাল মামলার অন্যতম আসামি সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর জামিন আবেদন নাকচ করে দেন আদালত। শুনানি শেষে বিচারক শাহেদ নূরউদ্দিন আগামী ২০ জুলাই পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন।


গতকাল সকালে মামলার শুনানি শেষে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়া সাংবাদিক ও আইনজীবীদের উদ্দেশে কথা বলেন। উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বিএনপি’র সাথে সমঝোতার কথা বলেছেন­ এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে খালেদা জিয়া বলেন ‘কিসের সমঝোতা? কোনো সমঝোতার কথা আমি জানি না । বিএনপি এ রকম সমঝোতায় বিশ্বাস করে না। ’
বিএনপিই ১/১১ সৃষ্টি করেছে বলে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমানের অভিযোগের ব্যাপারে তার অভিমত জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘কার জন্য ১/১১ হয়েছে তা জনগণই জানে। ভিডিও ক্যাসেট রয়েছে। কিভাবে মানুষ হত্যা করা হয়েছে তা আপনারাই জানেন, দেখেছেন। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি করা ঠিক হবে না। এখন যে সঙ্কট চলছে তা উত্তরণে কাজ করতে হবে। এখন ঝগড়া-বিবাদের সময় নয়। কাদা ছোড়াছুড়ির সময় নয়। বর্তমানের সঙ্কট থেকে উত্তরণে একটি অবাধ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’
তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানের বর্তমান অবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক রাষ্ট্রপতির ছেলে তারা। শহীদ জিয়া দেশের মানুষের শান্তির জন্য, মঙ্গলের জন্য জীবন দিয়েছেন। আমার ছেলেরা ছোটবেলায় তাকে হারিয়েছে। এরপর অনেক কষ্ট করে তাদের মানুষ করেছি। তারা অসুস্থ। তাদের চিকিৎসা হচ্ছে না। এটা অমানবিক। তাই তাদের সুচিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠাতে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।
দলের সংস্কারের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমার দলের সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করবে। বিএনপি এক ও ঐক্যবদ্ধ আছে। অনেক রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন করেছি। ৯ বছর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করেছি। চোখের সামনে এভাবে দেশকে শেষ হতে দিতে পারি না।’
সংস্কারপন্থীদের দলে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হবে কি না জানতে চাইলে খালেদা জিয়া বলেন, ‘তারা (সংস্কারপন্থীরা) দলেই আছেন। দলের জন্য কাজ করতে পারেন। এজন্য বৈঠকের প্রয়োজন নেই। আনুষ্ঠানিক বৈঠকের কী আছে? দলের সিনিয়র নেতারা তাদের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা নেবেন।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ব্যাপারে অর্থ উপদেষ্টার সাম্প্রতিক বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শায়েস্তা খাঁর আমলের কথা বলে তিনি গরিব মানুষের সাথে উপহাস করেছেন। সরকারের দায়িত্ব মানুষকে বাঁচানো। উপদেষ্টা শায়েস্তা খাঁর আমলের কথা বলেছেন। আমি তাকে বলব, এত পেছনে যাওয়ার দরকার নেই। আমার সময় জোট সরকারের আমলে মানুষ তিন বেলা পেট পুরে খেতে পারত, ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করাতে পারত। দ্রব্যমূল্যের এ অবস্থা ছিল না। মানুষ আয় করেছে খরচও করেছে। সেই সময়ের জমানো টাকা তারা এখন খরচ করে চলছে। মানুষকে বাঁচান। তারা হাহাকার করছে।’
তিনি বলেন, ‘দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে এ সরকার ব্যর্থ হয়েছে। আমি এ জন্য তাদের দোষারোপ করব না। তারা তো এ বিষয়ে দক্ষ নয়। জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার থাকলে ঠিকই এ বিষয়ে সমাধান হতো।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে মানুষ না খেয়ে আছে। কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। ছেলেমেয়েকে খেতে না দিতে পেরে মানুষ তাদের পুকুরে ছুড়ে মেরে পরে আত্মহত্যা করছে। এ অবস্থা দেখে জেলে বসে আমি চোখের পানি ফেলা ছাড়া আর কী করতে পারব? এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ, অবিলম্বে নির্বাচন দিয়ে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।’
খালেদা জিয়া বলেন, ‘দেশে বন্যা আসছে। বন্যাদুর্গতরা সাহায্য পাবে না। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ক্ষমতায় থাকলে তাদের সহযোগিতা করতে পারতেন।’
সরকারের সাথে সংলাপে যাবেন কি না জানতে চাইলে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমি কারাবন্দী। এ ব্যাপারে চারদলীয় ঐক্যজোটের নেতারা যে সিদ্ধান্ত নিবেন তা-ই আমার সিদ্ধান্ত।’
১৮ জুলাইয়ের মধ্যে ভারত ট্রানজিট চেয়েছে, এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কারাগারে চারটি মাত্র পত্রিকা পাই। কারো সাথে কথা বলতে পারি না।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সহযোগিতার মনোভাব প্রকাশ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমরা সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চাই, কারো সাথে সংঘাত চাই না। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চাই। নির্বাচন নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করতে চাই। সরকার বলেছে ডিসেম্বরে সংসদ নির্বাচন হবে। এটা দুই মাস আগে অক্টোবরে করলে আপত্তি কোথায়? এতে দেশের বর্তমানের দুর্ভোগও কমত। সংসদ নির্বাচনের আগে উপজেলা নির্বাচন করে লাভ হবে না। এতে সঙ্কট আরো বাড়বে।’
জরুরি অবস্থা সম্পর্কে খালেদা জিয়া বলেন, ‘এ আইনের জন্য মানুষ কথা বলতে পারছে না, গণমাধ্যমগুলো স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারছে না। আজ নির্বাচিত সরকার থাকলে সঙ্কট উত্তরণে সমাধানের একটি পথ পাওয়া যেত। কিন্তু এভাবে অবরুদ্ধ অবস্থায় দেশ চলতে পারে না।’ পরে খালেদা জিয়াকে বিশেষ কারাগারে পাঠানো হয়।
১৬ আসামির আদালতে প্রবেশঃ গতকাল সকাল সোয়া ১০টায় সাবেক মন্ত্রী আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, এম শামসুল ইসলাম, এম কে আনোয়ার, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ ১৫ জন আসামিকে বিশেষ আদালত ৩-এর পাশে হাজতখানা থেকে আদালতে আনা হয়। বেলা সাড়ে ১০টায় বিশেষ কারাগার থেকে খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালতে খালেদা জিয়াসহ আটককৃত ১৭ আসামির ১৬ জন উপস্থিত থাকলেও ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দেয়ায় খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে হাজির করা হয়নি। তার পক্ষে হাজিরা দেন তার আইনজীবী মোঃ তাহেরুল ইসলাম তাওহিদ।
এর আগেই আসামিপক্ষের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমাদ, সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুর রেজাক খান, ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক, সানাউল্লাহ মিয়া, ইসমাইল হোসেন, হাজী নজরুল ইসলাম, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, অ্যাডভোকেট ফেরদৌস আক্তার ওয়াহিদাসহ অর্ধশতাধিক আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। তবে অন্যান্য মামলার শুনানিতে দলের মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন উপস্থিত থাকলেও গতকাল তিনি আদালতে ছিলেন না।
মামলার শুনানিঃ গতকাল সাড়ে ১০টায় বিচারক এজলাসে এলে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক মামলার অভিযোগ গঠনের অনুমোদনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বলেন, ‘ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হচ্ছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। অথচ এ মামলায় মন্ত্রিপরিষদের সচিব ড. সা’দত হুসেইন ও সচিব মানিক লাল সমাদ্দার, মির্জা তাসাদ্দুক বেগসহ সচিবদের অভিযুক্ত করা হয়নি। কেবল উদ্দেশ্যমূলকভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীদের অভিযুক্ত করা হয়েছে।’
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করে জানতে চান, কেন ড. সা’দত হোসেনকে আসামি করা হয়নি। কারণ তিনিই প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে তার জামিনেরও আবেদন জানান। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল, গোলাম হাফিজ ও মিজানুর রহমান এর বিরোধিতা করেন। মাওলানা নিজামীর জামিন আবেদনের ব্যাপারে আদেশ পরে দেয়া হবে বলে জানানো হয়। পরে গতকাল বিকেলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী গোলাম হাফিজ জানান, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত।
এ দিকে গতকালের শুনানিতে খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুর রেজ্জাক খান সুপ্রিমকোর্টে গ্যাটকো মামলা স্থগিতসংক্রান্ত একটি একটি লিভ টু পিটিশনের শুনানির কথা আদালতে অবহিত করে দুই সপ্তাহের জন্য মামলার কার্যক্রম মুলতবি করার আবেদন জানালে বিচারক আগামী ২০ জুলাই পরর্বর্তী শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন।

আপনার মন্তব্য দিন

You must be logged in to post a comment.