12th Jul 2008
ইরানের ক্ষেপনাস্ত্র ক্ষমতা

ইরানের দু’দফা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তোলপাড় চলছে। ইরানী ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার জবাবে মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার সামরিক স্থাপনাগুলোকে সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সম্মিলিত সামরিক অভিযান ইরান মোকাবিলা করতে পারবে কিনা তা নিয়ে অনেকে মাথা ঘামাচ্ছেন। অবশ্য একথা সত্যি যে, এ দু’টি দেশ হামলা চালালে ক্ষেপণাস্ত্র হবে ইরানের একমাত্র ভরসা। তবে ক্ষেপণাস্ত্র শক্তিতে ইরানের অবস্থান কোথায় তা পরিষ্কার নয়।
এ পর্যন্ত ইরানের হাতে যেসব ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সিএসএস-৪। এ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ১৫০ কিলোমিটার। ১৯০ কেজি যুদ্ধাস্ত্র বহনে সক্ষম এ ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ২ শ’ বলে জানা গেছে। দেশটির হাতে আরো রয়েছে এম-১১। এম-১১ এর পাল্লা হলো ২৮০ কিলোমিটার। ৮০০ কেজি যুদ্ধাস্ত্র বহনে সক্ষম এ ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ৩০-৫০টি। স্কাড-বি রয়েছে ১০০ থেকে ৪০০টি। এর পাল্লা ৩০০ কিলোমিটার। এটি ৯৮৫ কেজি যুদ্ধাস্ত্র বহনে সক্ষম। স্কাড-সি ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে ১০০ থেকে ১৭০টি। তার পাল্লা হলো ৫০০ কিলোমিটার। এটি ৬০০ কেজি যুদ্ধাস্ত্র বহন করতে পারে। তবে শাহাব হচ্ছে ইরানের প্রতিরক্ষার মূলস্তম্ভ। এ ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা কত তা জানা যায়নি।
গত মঙ্গল ও বুধবার পরপর দু’দিন ইরান দূরপাল্লার শাহাব-৩ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। শাহাবের ইংরেজী করলে দাঁড়ায় ‘শুটিং স্টার’, ফারসীতে ‘জলজল’ এবং বাংলায় ‘ভূমিকম্প।’ শাহাবের পাল্লা হচ্ছে ১ হাজার ৩৫০ থেকে ১ হাজার ৬শ’ কিলোমিটার। এটি এক হাজার থেকে ৭৬০ কেজি যুদ্ধাস্ত্র বহনে সক্ষম। এছাড়া, শাহাব রাডার ফাঁকি দিয়ে ভূমি, জল ও স্থলে লক্ষ্যস্থলে আঘাত হানতে সক্ষম।
রাজধানী তেহরানের উত্তরে শহীদ হেমাত ইন্ডাস্ট্রিজ ও শহীদ বাগারি ইন্ডাস্ট্রিজ সম্মিলিতভাবে এ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে। তবে এ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে উত্তর কোরিয়ার নোডং ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে বলে কোনো কোনো সামরিক বিশেষজ্ঞ ধারণা করছেন। উত্তর কোরিয়া গর্বাচেভ আমলের সোভিয়েত কারিগরি সহযোগিতায় এ ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ করে। তাতে চীনেরও অবদান ছিল। ইরান অর্থনৈতিক সহায়তা যুগিয়েছে। সোভিয়েত স্কাড ও এসএলবিএম’র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ‘আকাদা ভি, পি, মাকায়েভ ওকেবি’ নোডং ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণে সহায়তা দিয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। নোডং ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি লাভের আগে উত্তর কোরিয়া স্কাড-বি রকেট ইঞ্জিন আমদানি করেছিল। সোভিয়েত এন-৪ এসএলবিএম’ও উত্তর কোরিয়ায় পাচার করা হয়েছে বলে কেউ কেউ বলছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কৌশলগত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে মাকায়েভ ওকেবির দক্ষ লোকজন বেকার হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিন উত্তর কোরিয়ায় পাচার করা হয়। পরে সেখান থেকে পাচার করা হয় ইরানে। ১৯৯৩ সালের শেষদিকে ইরানে নোডং প্রযুক্তির প্রথম চালান পাঠানোর কথা ছিল। তবে উত্তর কোরিয়ার উপর মার্কিন চাপে এ চালান স্থগিত রাখা হয়। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়, ১৯৯৫ সাল নাগাদ ইরান উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির চালান লাভ করতে পারেনি। ১৯৯৬ সালে গোয়েন্দা সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে ইসরাইলী মিডিয়ার খবরে বলা হয়, উত্তর কোরিয়া কমপক্ষে এক ডজন নোডং ক্ষেপণাস্ত্র ইরানে পাঠায়। তবে ১৯৯৬ সালে এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন জেনারেল পিয়াই দাবি করেন যে, অর্থনৈতিক কারণে উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে নোডং ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়ে ইরানের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ১৯৯৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটন টাইমসের এক খবরে বলা হয়, ইরান চীনের ‘গ্রেট ওয়াল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন’-এর কাছ থেকে দিকনির্দেশনা ও মোটর প্রযুক্তি এবং ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করার প্রযুক্তি লাভ করে। ওয়াশিংটন পোস্টের এ খবরেই প্রথম ইরানের শাহাব-৩ এবং শাহাব- ৪ ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ দু’টি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে গনচীন ও রাশিয়ার কাছ থেকে ইরান উল্লেখযোগ্য সহায়তা পেয়েছে। শাহাব-৪ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা হচ্ছে ১ হাজার ৯৯৫ কিলোমিটার। তবে এ ক্ষেপণাস্ত্র এখনো পরীক্ষা করা হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে আগামী দু’তিন বছরের মধ্যে এ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাবে ইরান।
১৯৯৭ সালের ১৮অক্টোবর ওয়াশিংটন পোস্টের আরেক খবরে বলা হয়েছিল, ইরান আগামী তিন বছরের মধ্যে উত্তর কোরীয় মডেলের শাহাব-৩ এবং শাহাব-৪ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাবে। ১৯৯৭ সালের মাঝামাঝি ইসরাইলী গোয়েন্দা সূত্রে বলা হয়, বর্তমান গতি অব্যাহত থাকলে ১৯৯৯ সালের শেষ নাগাদ এ দু’টি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজ শেষ হবে। ১৯৯৮ সালের ১৬ জুন ওয়াশিংটন পোস্টের অন্য এক খবরে বলা হয়েছিল, ইরান ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা মনিটরিংয়ের জন্য চীনের কাছ থেকে ‘টেলিমেট্রি যন্ত্রপাতি’ ক্রয় করেছে। চায়না গ্রেট ওয়াল ইন্ডাস্ট্রিজ শাহাব-৩ এবং শাহাব-৪ এর পুরো টেলিমেট্রি অবকাঠামো সরবরাহ করে। চীন ১০৫ মাইল পাল্লার এনপি-১১০ ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণে ইরানকে সহায়তা করেছে। তেহরান ১৯৯৮ সালের ২২ জুলাই প্রথম শাহাব-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। ২৪ জুলাই ৬২০ মাইল উড্ডয়নের ১ শ’ সেকেন্ড পর অন্য একটি ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরিত হয়। এটি দুর্ঘটনাক্রমে ঘটেছিল কিনা তা স্পষ্ট নয়।
আপনার মন্তব্য দিন
You must be logged in to post a comment.