13th Jul 2008
বিদেশী শ্রমবাজারে বিপর্যয়ের আশঙ্কা

দু’বছরের মধ্যে রেমিট্যান্স কমতে শুরু করবে; অধিকাংশ শ্রমবাজারের নতুন চুক্তি নেই; বিদেশ থেকে শ্রমিক আসছে বেশি, যাচ্ছে কম
তৌহিদুল ইসলাম
বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে জনশক্তি রফতানির হার। নামতে শুরু করেছে রেমিট্যান্সের সূচক। এ মুহূর্তে এর ভয়াবহতা পুরোপুরি উপলব্ধি করা না গেলেও ২০১০ সাল নাগাদ এটা পরিষ্কার হবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এ ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি দশকের শেষ প্রান্তে কয়েক লাখ বাংলাদেশী প্রবাসী কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হবে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরকারিভাবে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা স্বীকার করা না হলেও বর্তমানে কয়েকটি দেশে বিরাজমান পরিস্থিতি এই বাস্তবতারই প্রমাণ বহন করে।
দেশে দেশে বাংলাদেশী কূটনৈতিক তৎপরতার অপর্যাপ্ততা, আন্তর্জাতিক চক্রের প্রভাব ও কিছু প্রবাসী বাংলাদেশীর হীন কর্মকাণ্ড শ্রমবাজার সঙ্কোচনের নেপথ্যে কাজ করছে। সর্বোপরি গোটা বিশ্বে অস্থিরতা, দারিদ্র্য বৃদ্ধি ও খাদ্য সঙ্কটের ফলে ব্যয় সঙ্কোচন নীতির আওতায়ও অজস্র বাংলাদেশী কাজ হারাবেন। কয়েক বছর থেকে বৃহৎ শ্রমবাজার হিসেবে খ্যাত সৌদি আরব, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ কোটা হারাতে শুরু করে। কিন্তু সরকারের উদাসীনতা ও কূটনৈতিক অদক্ষতার কারণে পরিস্থিতি মোকাবেলা সম্ভব তো হয়ইনি, নতুন কোনো বাজার সৃষ্টিতেও তারা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
সরকারের হিসাবে (বিএমইটি), ১৯৭৬ সাল থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন পর্যায়ে মোট ৫৭ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪৮ জন শ্রমিক বৈধভাবে কাজ করতে গেছে। এ থেকে আয় হয়েছে ২ লাখ ৮২ হাজার ৫৬০ দশমিক ৫৩ কোটি টাকা। ২০০৭ সালে শ্রমিক রফতানি হয়েছে ৮ লাখ ৩২ হাজার ৬০৯ জন, তা থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৪৫ হাজার ৭৩৯ দশমিক ৮৬ কোটি টাকা। চলতি বছর রফতানি হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮৯৪ জন এবং রেমিট্যান্স এসেছে ২৫ হাজার ৭৬১ দশমিক ৮ কোটি টাকা।
জনশক্তি রফতানির ব্যাপারে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক আবদুল মালেক ‘নয়া দিগন্ত’কে বলেন, বর্তমানে কোনো দেশেই শ্রমিকদের কোনো সমস্যা নেই। তিনি বলেন, গত জুন মাসে রেকর্ডসংখ্যক (৯৪ হাজার) শ্রমিক বিভিন্ন দেশে গেছে। প্রতিদিনই ৩ থেকে ৪ হাজার শ্রমিক বিদেশে যাচ্ছে।
তবে তার এই বক্তব্যের সাথে বাস্তবতার বেশ কিছু অমিল খুঁজে পাওয়া যায়। উল্লেখ্য, সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার হিসেবে খ্যাত সৌদি আরবেই বাংলাদেশ কোটা সঙ্কটে পড়েছে। বর্তমানে সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশীর সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। মোট কর্মক্ষেত্রের ২৫ ভাগই দখল করে আছেন বাংলাদেশীরা। সৌদি কতৃêপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই কোটা ১০ ভাগে নামিয়ে আনা হচ্ছে। যারা এখনো সেখানে কর্মরত আছেন তাদের ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ আর বৃদ্ধি করা হচ্ছে না। অনেকেই এর মধ্যে দেশে ফিরে আসতে শুরু করেছেন। তবে সৌদি প্রবাসীদের মতে, আগামী বছর থেকে ফিরে আসার মাত্রা বহু গুণ বেড়ে যাবে।
উল্লেখ না করলেই নয়, যেখানে সৌদি সরকার আগামী পাঁচ বছরে দেশটিতে ব্যাপক শিল্পায়ন পরিকল্পনার আওতায় নতুন করে ৫০ লাখ শ্রমিক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ তাদের কোটা হারাতে শুরু করেছে। অপর দিকে ভারত ও পাকিস্তান নানা কৌশলে বাংলাদেশের বাজার নষ্ট করে নতুন বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। একই অবস্থা বিরাজ করছে মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, বাহরাইন, কাতার, ওমান, লেবানন ও রুমানিয়ায়ও। মালয়েশিয়া যেখানে বাংলাদেশ থেকে ৭ লাখ শ্রমিক চেয়ে সরকারিভাবে উদ্যোগ নিয়েছিল, সেখানে আড়াই লাখ রফতানির পর তা প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। উপরন্তু বিভিন্ন অভিযোগে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশীকে মালয়েশিয়া থেকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। বাহরাইনে একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সেখানে বাংলাদেশীদের ভিসা প্রদানই বন্ধের পথে। সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও এশিয়ার অন্যান্য দেশেও বাংলাদেশীদের ভিসা প্রদানে কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে।
বিএমইটি’র এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০৭ সালে সৌদি আরবে ২ লাখ ৪ হাজার ১১২, আরব আমিরাতে ২ লাখ ২৬ হাজার ৩৯২, কুয়েতে ৪ হাজার ২১২, ওমানে ১৭ হাজার ৪৭৮, কাতারে ১৫ হাজার ১৩০, বাহরাইনে ১৬ হাজার ৪৩৩, লেবাননে ৩ হাজার ৫৪১, জর্ডানে ৪৯৪, লিবিয়ায় ১ হাজার ৪৮০, সুদানে ১ হাজার ৭২৬, মালয়েশিয়ায় ২ লাখ ৭৩ হাজার ২০১, সিঙ্গাপুরে ৩৮ হাজার ৩২৪, ইতালিতে ১০ হাজার ৯৫০ ও ব্রুনাইয়ে ১ হাজার ১৮৬ জন শ্রমিক রফতানি হয়েছে। সেখানে চলতি বছর রফতানি হয়েছে সৌদিতে ৯০ হাজার ২৩৪, আরব আমিরাতে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪৮৪, কুয়েতে ৬, ওমানে ২১ হাজার ৮২৯, কাতারে ১২ হাজর ৭০, বাহরাইনে ৮ হাজার ৭৯২, লেবাননে ১ হাজার ৫৭৫, জর্দানে ১৯৫, লিবিয়ায় ১ হাজার ২৪৮, সুদানে ১১১, মালয়েশিয়ায় ৩৮ হাজার ৩৩২, সিঙ্গাপুরে ২২ হাজার ৩৫৪, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৩৭ ও ইতালিতে ৩ হাজার ৫৪৩ জন।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, শ্রমিক নিয়োগকারী দেশগুলো যেভাবে ছাঁটাই ও কন্ট্র্রাক্ট বাতিল শুরু করেছে তাতে করে আগামী বছর থেকে রফতানির এই চিত্র পাল্টে যাবে।
আপনার মন্তব্য দিন
You must be logged in to post a comment.