13th Jul 2008

ট্রানজিট হচ্ছে বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে গিলে খাওয়ার ভারতীয় নীতি

-তালুকদার মনিরুজ্জামান

অধ্যাপক তালুকদার মনিরুজ্জামান। খ্যাতিমান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও জাতীয় অধ্যাপক। ভারতকে ট্রানজিট প্রদান নিয়ে সম্প্রতি যে আলোচনা হচ্ছে তা নিয়ে তিনি ‘নয়া দিগন্ত’-এর সাথে খোলামেলা কথা বলেছেন। একজন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হিসেবে তার মতামত ব্যক্ত করেছেন। অধ্যাপক তালুকদার মনিরুজ্জামানের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলফাজ আনাম :
নয়া দিগন্তঃ ভারত আবারো বাংলাদেশের কাছে ট্রানজিট চেয়েছে। এ মাসে নয়াদিল্লিতে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করা হবে বলে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?
তালুকদার মনিরুজ্জামানঃ আমার মতে, ট্রানজিট হলো বর্তমান অনির্বাচিত ও ভারতের প্রতি দুর্বল সরকারকে চাপে রেখে বাংলাদেশকে গিলে খাওয়ার ভারতীয় নীতি। অতীতে হাসিনা-খালেদা সরকারের ওপরও ভারত ট্রানজিটের জন্য চাপ দিয়েছিল। কিন্তু জনমতের কথা বিবেচনা করে এ ব্যাপারে তারা এগোয়নি। বর্তমান অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার যদি এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেয় তবে তা হবে দেশের জন্য এবং তাদের জন্য আত্মঘাতী।
নয়া দিগন্তঃ বর্তমান সরকার কি এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে?


তালুকদার মনিরুজ্জামানঃ কখনোই না। মনে রাখতে হবে এটা শুধু রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী প্রশ্ন নয়, এর সাথে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রশ্ন গভীরভাবে সম্পৃক্ত। কোনো অনির্বাচিত সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার নেই। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক অস্তিত্বের সাথে জড়িত কোনো সমস্যা দেখা দিলে নির্বাচিত সরকারও সে ক্ষেত্রে গণভোটের ব্যবস্থা করে এবং সেই গণভোট অনুযায়ী যথাযথ আইন প্রণয়ন করে। যেমন গ্রেট ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেবে কি না সে প্রশ্নের সমাধানের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গণভোটের ব্যবস্থা করেছিলেন এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ হওয়ার পরই তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদান করে। আমাদের এখন তো সংসদ নেই, এখন ট্রানজিট দেয়ার প্রশ্ন আসে কী করে?
নয়া দিগন্তঃ ইউরোপে ট্রানজিট চালু আছে­ এমন যুক্তিও তো আছে।
তালুকদার মনিরুজ্জামানঃ দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ভর করে উন্নয়ন স্তর (খপংপল সফ উপংপলসহশপষয়)-এর ওপর। ইউরোপের সব দেশের ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট একই স্তরের এবং উন্নত। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়নের অভিন্ন স্তরে পৌঁছলে ট্রানজিট সবার পক্ষে উপকারী হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পার্থক্য শুধু আয়তনগত নয়, সব দিক দিয়ে। ভারত সামরিক-অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেকটা উন্নত। এ রকম অসম অর্থনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনীতি শাস্ত্র (ঝধমপষধপ সফ ঊধসষসশমধঢ়) অনুযায়ীই ভারতের অঙ্গীভূত হয়ে বাংলাদেশ অবশেষে রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব হারাবে। বাংলাদেশের সচেতন দেশপ্রেমিক ও দায়িত্বশীল জনগোষ্ঠী এ কারণেই ট্রানজিটের প্রবল বিরোধী।
নয়া দিগন্তঃ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো সঙ্কট দেখা দেবে বলে মনে করেন কি?
তালুকদার মনিরুজ্জামানঃ যদিও ট্রানজিটকে ভারত অর্থনৈতিক বিষয় হিসেবে দেখাচ্ছে, আসলে তাদের মূল উদ্দেশ্য সামরিক কৌশলগত (ঝয়ড়থয়পবমধ)। পূর্ব-উত্তর ভারতের সাতটি রাজ্যের বিদ্রোহ দমনে এবং ভবিষ্যতে চীনের সাথে কোনো যুদ্ধের আশঙ্কার সময় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে দ্রুত সামরিক সরঞ্জাম এবং সৈন্য পাঠানোর জন্য ট্রানজিট তথা করিডোর পাওয়ার জন্য ভারত মরিয়া হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক লাভ (২ হাজার কোটি টাকা) হবে বলে যে আজগুবি পরিসংখ্যান দেয়া হয়, তা আরব্য উপন্যাসের দৈত্যের কাহিনীকেও হার মানায়। ভারত কর্তৃক বাংলাদেশকে এই রাজস্ব দেয়া দৈত্যের টাকা নিয়ে আসার মতো। চীনের সাথে ভারতের কখনো যুদ্ধ শুরু হলে কিংবা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের বিচ্ছিন্নতা পরিপূর্ণতা লাভের দিকে গেলে ভারত বাংলাদেশের অনুমতি না নিয়েই ট্রানজিট নামের এই করিডোর ব্যবহার করবে। এখানে ঐতিহাসিক উদাহরণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে হিটলারের আক্রমণের ভয়ে ফ্রান্স তার জার্মানির সীমান্তে অপ্রতিরোধ্য দুর্গ (গথবমষসয় লমষপ) তৈরি করে। সমরবিশারদ হিটলার ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধে না জড়িয়ে সহজে ফ্রান্স দখলের জন্য বেলজিয়ামের মধ্য দিয়ে ফ্রান্স দখল করে। ওই দুর্গ কোনো কাজে আসেনি। ভারতও চীনের সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধে একই পদ্ধতি অবলম্বন করবে।
নয়া দিগন্তঃ ট্রানজিটের ফলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে বলে বলা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের রাস্তা সংস্কার ও অবকাঠামোগত যে ব্যয় হবে, তাতে কি বাংলাদেশ লাভবান হবে?
তালুকদার মনিরুজ্জামানঃ আমি তো আগেই বলেছি অর্থনৈতিক দিক থেকে ট্রানজিটের ফলে বাংলাদেশের লাভবান হওয়া আরব্য উপন্যাসের দৈত্যের অলৌকিকভাবে ধন আহরণের মতো ব্যাপার। এর ফলে বাংলাদেশের অবকাঠামো (ওষফড়থঢ়য়ড়ৎধয়ৎড়প) ধ্বংস হয়ে যাবে। বলা হচ্ছে, ভারত অবকাঠামোর জন্য কিছু টাকা দেবে। আসলে ভারতের মতো দেশ তা দেবে কি না বা দিতে পারবে কি না আমার সন্দেহ আছে। এ প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে, ভারত কর্তৃক প্রদত্ত ওয়াদাগুলো যেমনঃ বেরুবাড়ী হস্তান্তর প্রায় ৩০ বছরেও কিন্তু পূরণ হয়নি। ভারতের নিজেরই বৈদেশিক ঋণ ৬০ থেকে ৭০ বিলিয়ন ডলার।
নয়া দিগন্তঃ ট্রানজিটের সাথে আস্থার প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। ভারতের ওপর আস্থা রাখা যায় না কেন?
তালুকদার মনিরুজ্জামানঃ ভারত ও বাংলাদেশের ইতিহাস (ঞড়থধর জপধসড়ন) থেকে প্রমাণিত হয় বাংলাদেশকে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার নৈতিক দায়িত্বের কোনো তোয়াক্কাই করে না ভারত (যেমনঃ গঙ্গার পানি বণ্টন, সীমান্ত চুক্তির রেটিফিকেশন ও বেরুবাড়ী হস্তান্তর এমনকি সিডরের পর পাঁচ লাখ টন চাল বিক্রির প্রসঙ্গ)। ইতিহাসের সাক্ষ্য হলোঃ যেকোনো বৃহত্তর রাষ্ট্র তার সীমান্তবর্তী ছোট দেশকে ঠকাতে বা গ্রাস করতে কুণ্ঠিত হয় না। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত মেক্সিকোর উত্তরাংশ দখল করে নিয়েছে, যেটা বর্তমানে নিউ মেক্সিকো প্রদেশ হিসেবে পরিচিত। অস্ট্রো-হাঙ্গেরি ও জার্মানি দিয়ে পরিবেষ্টিত পোল্যান্ডকে তিনবার স্বাধীনতা হারাতে হয়েছে। কিন্তু দেশপ্রেমিক পোলিশরা দ্বিতীয় মহাযুুদ্ধের সময় ঘোড়া দিয়ে জার্মান ট্যাঙ্ক বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেছে। পোলিশদের মতো দেশপ্রেম থাকলেই কেবল একটি ছোট রাষ্ট্র বৃহৎ রাষ্ট্রের পাশেও দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারে।
নয়া দিগন্তঃ নিরাপত্তার কারণে নেপালকে ট্রানজিট দেয়নি ভারত। বাংলাদেশ দিলে নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন হবে কি না।
তালুকদার মনিরুজ্জামানঃ ভারত যখন নেপালের মতো ছোট রাষ্ট্রকে বড় রাষ্ট্র হয়েও ১৫-২০ মাইল ট্রানজিট দেয়নি, সেখানে বাংলাদেশ কেন ৫০০ মাইল ট্রানজিট দেবে?

আপনার মন্তব্য দিন

You must be logged in to post a comment.