13th Jul 2008
নোয়াখালীর লোকমুখে
-মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন
বর্তমানকালের প্রশাসনিক জেলা নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর আশির দশকের আগেও নোয়াখালী প্রশাসনিক জেলা নামে পরিচিত ছিলো। বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার অধিবাসীদের নিয়ে নানা কথা, নানা রসিকতা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্যের এবং বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীদের কাছে উপজীব্য হয়ে আছে। নোয়াখালী শব্দকে কেউ কেউ নিউক্যালি নামে ডেকে আনন্দ অনুভব করেন। নোয়াখালীর মানুষকে নিয়ে বহুবিধ রসিকতা আছে। যেমনঃ ”প্রতিযোগিতা হচ্ছে যে কে কতো বেশী গুল মারতে পারে। নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় গুল মারা মানে চাপাবাজি করা। জুরিদের কাছে এক প্রতিযোগী এসে এভাবে তাঁর গুল মারা শুরম্ন করলেন, একবার নোয়াখালীর এক ভদ্রলোকঃ জুরিগণ প্রতিযোগীকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ব্যস্ ব্যস্ হয়েছে, আর গুল মারতে হবে না। অর্থাৎ
নোয়াখালীতে ভদ্রলোক বাস করে বা নোয়াখালীর কোন মানুষ ভদ্রলোক হতে পারে - এর থেকে বড় গুল বা চাপা আর হতে পারে না।” উপরোক্ত নমুনা রসিকতার মতো হাজারো রসিকতা নোয়াখালীর মানুষ হজম করে খেলোয়াড়সুলভ প্রত্যয় নিয়ে।
নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষা এবং নোয়াখাইলস্ন্যা কালচার বা বিশেষ জীবনযাপন সংস্কৃতি নোয়াখালীর প্রশাসনিক সীমানার বাইরেও প্রসারিত। ফেনী নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের সীমানার বাইরে দড়্গিণ ও পূর্বদিকে বর্তমানকালের চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুন্ড (উত্তর), মীরেরসরাই, সন্দ্বীপ, পূর্বদিকে খাগড়াছড়ি জেলার রামগড়, কুমিলস্না জেলার চৌদ্দগ্রাম, কুমিলস্না সদর (দড়্গিণ), লাকসাম, চাঁদপুর জেলার হাজিগঞ্জ, শাহরাস্তিô, মতলব (দড়্গিণ), চাঁদপুর (দড়্গিণ), ফরিদগঞ্জ, হাইমচর, পশ্চিমদিকে ভোলা জেলার উত্তর-পূর্ব ও দড়্গিণাঞ্চল এবং মনপুরা দ্বীপ- এই বিশাল অঞ্চল নিয়ে নোয়খালীর আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতি অঞ্চল গঠিত।
এই অঞ্চলের জীবনযাপন পদ্ধতি, আঞ্চলিক ভাষা (নোয়াখাইলস্ন্যা ডায়্যালেক্ট) ও সংস্কৃতি, ভাব প্রকাশে দেহভঙ্গি, শেস্নষ, রসিকতা, রন্ধন প্রক্রিয়া ও ভোজন-বিলাসিতা, বচন, উপদেশাবলী, আন্তôঃব্যক্তি সম্পর্ক- সবকিছুই কম বেশী একরকম। ভাষা ও বক্তব্য প্রকাশের ভঙ্গি থেকে এই বৃহৎ অঞ্চলের একজন মানুষ অন্যজনকে তৎড়্গণাৎ চিনে ফেলতে পারে। এবং তাৎড়্গণিকভাবেই দু’জন অপরিচিত মানুষ হঠাৎ পরিচিতজন হয়ে যায়। জীবনযাপনের এই বৈশিষ্ট্যকে অনেকেই নোয়াখালী কালচার বা সংস্কৃতি নামে অভিহিত করেন।
নোয়াখালী সাংস্কৃতিক অঞ্চলের মানুষ কথায় কথায় হাজার রকম পরিস্থিতিতে সোলক্ কয়। কয় মানে বলে। সোলক্ মানে শেস্নাক ৈমানে বচন। প্রতিটি বচন তাৎড়্গণিক এবং বিষয় সম্পৃক্ত। কোনো কোনো বচন কাটা ঘায়ে নূনের ছিটার মতো কাজ করে। তবে প্রতিটি বচন এক একটি চাতুর্যপূর্ণ অভিব্যক্তি, প্রাণময়, উচ্ছল। বক্তার মানসিক ড়্গিপ্রতা লড়্গ্য ব্যক্তিকে আহত করে না, বিব্রত করে, জাগ্রত করে। ড়্গেত্রবিশেষে লড়্গ্য ব্যক্তিও বক্তার চাতুর্য উপভোগ করেন। যেমন, কোন ব্যক্তি যদি পছন্দ বহির্ভূত কোন আচরণ করেন তখন হয়তো তাঁকে বক্তা সম্বোধন করে বসলেন, ”কিও তালতো ভাই, এ্যামন করেন ক্যান্, কি অইচে!” এ ড়্গেত্রে তালতো ভাই মানে ভাইয়ের শ্যালক! অথবা কোন ব্যক্তি, বিশেষ করে আড্ডার আসরের ইয়ার যদি আসর ভেঙ্গে দ্রম্নত নিষ্ত্র্নান্তô হতে চান, তখন যে কোন ইয়ার বা বন্ধু বলে উঠলেন, ”কিরে, এতো তাড়া কিসের? চুরি করতে যাবি নাকি!”
চোরকে নিয়ে অনেক বচন প্রচলিত আছে, বিভিন্ন প্রেড়্গিতে। স্থান কাল পাত্র পরিবেশ মেজাজ প্রসংগে সব মিলিয়ে এক ধরনের দ্যোতনা সৃষ্টি হতে পারে যখন বক্তা, বক্তব্যের পাত্র, শ্রোতা - সকলেই বচন উপভোগ করেন।
”লোডা কিনি হোঁদ ছড়াইছে, চোরে বাড়ি ছাড়ে না।” লোডা মানে লোটা। হোঁদ মানে পশ্চাৎদেশ, পাছা। ছড়াইছে মানে সম্পদ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দান করেছে। চোরে বাড়ি ছাড়ে না মানে প্রতিদিনই সিঁদেল চোর বাড়িতে হানা দেয় লোটা চুরি করতে। এটি চোর বিষয়ক একটি অনবদ্য বচন।
গ্রামের মুসলমান অধূøষিত পাড়ার মানুষ যত গরীবই হোক, পাড়ার প্রথম ইটের ঘরটি হয় মসজিদ, তারপর ঈদগাহ, কবরস্থান, পুকুরঘাট, এবং সবশেষে বাসগৃহ। কারণ, মুসলমানগণ বিশ্বাস করেন, এ দুনিয়া ড়্গণস্থায়ী। স্বর্গ থেকে আত্মার আগমন, পৃথিবীর জীবন নশ্বর, এবং সৎকর্মের ফলে মৃত্যু পরবর্তী অবিনশ্বর জীবন স্বর্গে। এক অর্থে ধর্মপ্রাণ মুসলমানের জীবনই শুরম্ন হয় মৃত্যুর পরে। ইহ জাগতিক কর্মকান্ড যেন পর জাগতিকের প্রস্তôুতি।
ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির ফলে কোন এক ব্যক্তি পিতলের লোটা কিনেছেন অজু (নামাজ পূর্ববর্তী প্রড়্গালণ) এবং সৌচকর্মে পানি ব্যবহারের সুবিধার্থে। মাটির লোটা ভেঙ্গে যায়, বার বার কিনতে হয়, পিতলের লোটা ভাঙ্গে না। পিতলের লোটা সমৃদ্ধির প্রতীক।
ক্রেতার অর্থ সম্পদ যাই থাকুক না কেন, গ্রামের চোরের দৃষ্টিতে পিতলের লোটা অর্থ সম্পদের প্রতীক। প্রতি রাতেই সিঁদেল চোর পিতলের লোটা মালিকের বাড়িতে সিঁদ কাটতে হানা দেয়। গেরস্তেôর ঘুম হারাম। সে অর্থে বলা হয়, লোডা কিনি হোঁদ ছড়াইছে, চোরে বাড়ি ছাড়ে না।
’চোরের গা চেলস্নাত করে’। চোর বিষয়ক এ বচনটি অতিশয় প্রচলিত। তপ্ত খোলা বা তাওয়ায় এক ফোঁটা জল পড়লে চোঁৎ শব্দে জলের ফোঁটাটি যেভাবে নিমেষে বাস্প হয়ে যায় সে শব্দের বর্ণনাই নোয়াখালীর আঞ্চলিক কথ্য ভাষায় ’চেলস্নাত’। চেলস্নাত মানে ত্বরিৎ ক্রোধান্বিত প্রতিক্রিয়া। কোন দোষী ব্যক্তিকে কেহ অভিযুক্ত করলে দোষী ব্যক্তি যেভাবে নির্দোষ দাবীতে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে নোয়াখাইল্যাদের ভাষায় তার বর্ণনা হলো ’চোরের গা চেলস্নাত করে’।
’চোরের কিল মতনে খায়’। এ বচনে ’মতনে’ মানে নিরবে, কাউকে না জানিয়ে, না বলে, গোপনে। মতনে খাওয়া মানে বিষয়টা গোপন রাখা। সামাজিক বিচারে সুউচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন কোন ব্যক্তিকে নিম্নে অবস্থানরত কোন ব্যক্তি যদি অপমান করে এবং তখন যদি সম্মানী ব্যক্তি গোপনে সে অপমান সহ্য করে নেন, গোপন রাখেন, ঐ পরিস্থিতিকে তখন বর্ণনা করা হয় ’চোরের কিল মতনে খায়’।
’চোরের মায়ের বড় গলা’। এই বচনটি দেশের অন্য বহু অঞ্চলের মত নোয়াখালী অঞ্চলেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ’বড় গলা’ মানে বড় বড় কথা বলা, বাগাড়ম্বর করা, যা নয় তা দাবী করা, লজ্জা পাওয়ার বদলে আগ্রাসী ভাবের প্রকাশ। যে কোন সমাজে চোর অপরাধী বলে পরিগণিত হয়; চৌর্যøবৃত্তি সমাজের চোখে নিন্দনীয় পেশা; আইনের চোখে চুরি করা অপরাধ। কিন্তু চোরের পিতামাতা এবং স্বজন ব্যক্তিবর্গ যদি চোর বা চোরের পেশা বিষয়ে লজ্জা অনুভব না করেন বরং যদি সেই পেশা হতে আহরিত সম্পদ নিয়ে বড়াই করেন তখন ’চোরের মায়ের বড় গলা’ বচনটি ব্যবহার করা হয়। বস্তôুতঃ বর্তমান বাংলাদেশ নামক সমাজে ঘুষ রাহাজানী মওজুদদারী ও অপরাপর দুর্নীতির মাধ্যমে আহরিত সম্পদ সম্পর্কে দুর্নীতিবাজ ও তাদের আত্মীয়স্বজন বড়াই করেন এবং সমাজে মাথা উঁচু করে ঘুরে বেড়ান। ’চোরের মায়ের বড় গলা’ এদের ড়্গেত্রে অতিশয় প্রযোজ্য।
[ লেখকঃ সাবেক সচিব ]
আপনার মন্তব্য দিন
You must be logged in to post a comment.