14th Jul 2008

ট্রানজিটের নামে ভারত আসলে চায় করিডোর

ট্রানজিটের নামে মূলত করিডোর চাচ্ছে ভারত। কিন্তু ভারত সরকার করিডোরের কথা না বলে ট্রানজিট উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতি আদায়ের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও ভারত ট্রানজিটকে অর্থনৈতিক বিষয় হিসেবে দেখছে। আসলে ট্রানজিটের নামে করিডোরের উদ্দেশ্য হচ্ছে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলগত। বর্তমান সরকারও এ বিষয়ে জেনেও তা চেপে যাচ্ছে। তবুও সরকার পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের দুদিনব্যাপী বৈঠকে যোগদানের জন্য পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেনকে নয়াদিল্লি পাঠাচ্ছে। আগামী বুধবার তিনি নয়াদিল্লির উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করবেন। পররাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বে বড় একটি প্রতিনিধিদল নয়াদিল্লি পাঠানোর কথা থাকলে মিডিয়া প্রচারণার ফলে তা কাটছাঁট করে ২ সদস্যের প্রতিনিধিদল দিল্লি যাচ্ছে। এখন শুধুমাত্র পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে ওই মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (দক্ষিণ এশিয়া) মাহবুবউজ্জামান থাকবেন।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ভারত এই করিডোরের দাবি দেশ স্বাধীনের পর থেকেই করে আসছে। উত্তর-পূর্ব অংশের সঙ্গে ভারতের অন্য অংশের যোগাযোগ, পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের অংশ করিমগঞ্জ ভারতকে দিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু বিনিময়ে ভারত বেরুবাড়ি বাংলাদেশকে ফেরত দেয়নি। নানাভাবে টালবাহানার পর ভারত তাদের সুপ্রিম কোর্টে মামলা ঠুকে সব কিছু বন্ধ করে রেখেছে। সূত্র জানায়,

ভারত তার এক অংশ থেকে অন্য অংশে প্রবেশের জন্য করিডোরকে ট্রানজিট বলে চালিয়ে দিচ্ছে। এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়াকে ট্রানজিট বলা হয়। কিন্তু ভারত ট্রানজিটের নামে করিডোরের মাধ্যমে তার এক অংশ থেকে অন্য অংশে প্রবেশ করতে চায়। তবে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্যের বিদ্রোহ দমন এবং ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে দ্রুত সামরিক সরঞ্জাম ও সৈন্য এবং রসদ পাঠানোর জন্য বাংলাদেশের বুক চিরে এই করিডোর পাবার জন্য ভারত মরিয়া হয়ে উঠেছে। ভারতের এই দাবি পুরান হলেও বর্তমান সরকারের সময় তাদের দাবি আদায়ের মোক্ষম সময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশকে ২ হাজার কোটি টাকার আয় দেখানো হচ্ছে। অথচ বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশ যদি ভারতকে করিডোর দেয় তাহলে বাংলাদেশের রাস্তা, ব্রিজসহ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাবে। তাছাড়া ভারত যে করিডোর বাবদ দুই হাজার কোটি টাকা বছরে বাংলাদেশ সরকারকে দেবে তার গ্যারান্টি কোথায়? কেননা ভারত ইতিপূর্বে দেয়া কোনো ওয়াদা পূরণ করেনি। বেরুবাড়ি তিন দশকেও হস্তান্তর করেনি। তাছাড়া গঙ্গার পানি বণ্টন, সীমান্ত চুক্তির রেটিফিকেশন, সর্বশেষ সিডরের পর ৫ লাখ টন চাল নিয়ে ভারত কথা রাখেনি। এদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে নেপাল ও ভুটান ব্যবসা করার জন্য ১৫ থেকে ২০ মাইল পথ ট্রানজিট চাইলে ভারত তা দেয়নি। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কেন ভারতকে পাঁচশ মাইল করিডোর দেবে? এই প্রশ্ন দেশপ্রেমিক জনতার ও সচেতন জনগোষ্ঠীর। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারত করিডোর দাবি করে বসে নেই। বাংলাদেশকে চাপ দেয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে করিডোর আদায়ের জন্য লবিং চালিয়ে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে ইউরোপের কতিপয় দেশের উদাহরণ টেনে আনা হচ্ছে। এদিকে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে পুরো জাতি ফুঁসে উঠেছে। গতকাল রবিবার পৃথক বিবৃতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে বিরত থাকার আহবান জানান। বিজেপি : বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি’র চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান ও মহাসচিব শামীম আল মামুন এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাজ শুধু দেশে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন করা। ভারতকে এই মুহূর্তে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার ও ট্রানজিট দেয়ার মত স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নেয়ার জন্য তারা আহবান জানান। তারা বলেন, নির্বাচিত সরকার ও সংসদে আলোচনা ব্যতীত কোনো আন্তর্জাতিক বিষয়ে একটি অনির্বাচিত সরকার কোনো প্রকার চুক্তি করতে পারে না। জাগপা : জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও স্বাধীনতা বিরোধী চক্রান্ত মোকাবিলায় সাচ্চা দেশপ্রেমিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়েছেন। তিনি গতকাল রবিবার দলীয় কার্যালয়ে নগর জাগপা, ঢাকা জেলা জাগপা, মজদুর লীগ, মহিলা জাগপা, যুব জাগপা ও ছাত্রলীগের যৌথ প্রতিনিধি সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ আহবান জানান। সভায় বক্তব্য রাখেন পার্টির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক খন্দকার লুৎফর রহমান, সহ-সভাপতি মহিউদ্দিন বাবলু, কবিরুল ইসলাম কাঞ্চন, সরদার শাহজাহান, এমএ আনোয়ার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুর রহমান আসাদ, নগর জাগপা সদস্য সচিব সানাউল্লাহ সানু, ঢাকা জেলা জাগপা সমন্বয়ক আওলাদ হোসেন শিল্পী, মজদুর লীগের আহবায়ক এমএ আহাদ, মহিলা জাগপার সম্পাদিকা সেলিনা ফয়েজ, যুব জাগপার সদস্য সচিব জাহিদুল ইসলাম প্রিন্স, ছাত্রলীগের সদস্য সচিব সাইফুল আলম প্রমুখ। বিডিপি : বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দল (বিডিপি)র ভাইস প্রেসিডেন্ট এমএ মাজেদের সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট নাজিম হাবিব-উজ-জামান, সিনিয়র সহ-সভাপতি জিনিয়া নাজিম জামান, মোল্লা মোঃ ইউছুপ এবং মহাসচিব সরদার শাহাদৎ হোসেন। নাজিম হাবিব-উজ-জামান বলেন, যারা ইন্ডিয়ান আর্মিকে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বিনা শর্তে যাতায়াতে বিশ্বাসী তারাই করিডোরের নেপথ্যে ট্রানজিট চায়। শিবির : ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি মুহাম্মদ জাহিদুর রহমান বলেছেন, ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার মত জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার এই সরকারের নেই। গতকাল রবিবার এক বিবৃতিতে তিনি একথা বলেন। শিবির সভাপতি বলেন, কেয়ারটেকার সরকারের দায়িত্ব হলো একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে প্রস্থান করা। তাই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কোনো মতেই একটি অনির্বাচিত সরকার গ্রহণ করতে পারে না। একটি নির্বাচিত সরকারই একমাত্র ক্ষমতায় এসে সংসদে আলোচনার মাধ্যমে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। মুসলিম মিল্লাত : বাংলাদেশ মুসলিম মিল্লাত পার্টির উদ্যোগে গতকাল এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তব্য রাখেন পার্টির সভাপতি এডভোকেট আবুবকর ছিদ্দিক, এডভোকেট খাজা মাইনুদ্দিন, এডভোকেট এসএম সেলিম রেজা, এডভোকেট শাহাদাত হোসেন, আবদুল লতিফ, গোলাম মহিউদ্দিন প্রমুখ। বক্তারা ট্রানজিট প্রদানের যে কোনো সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে বিরত থাকার আহবান জানান।

আপনার মন্তব্য দিন

You must be logged in to post a comment.