14th Jul 2008
রাষ্ট্রপতির জারি করা মুসলিম বিয়ে ও তালাক অধ্যাদেশ হাইকোর্টে অবৈধ ঘোষণা
নির্বাচন সংক্রান্ত অধ্যাদেশের বাইরে সকল অধ্যাদেশের ভাগ্যও জড়িয়ে পড়তে পারে
স্টাফ রিপোর্টারঃ সারাদেশে কাজী নিয়োগের জন্য জারি করা মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন আইন (সংশোধন) ২০০৮ বাতিল ও অবৈধ ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। হাইকোর্ট অধ্যাদেশ অবৈধ ঘোষণা করে রায়ে বলেছেন, রাষ্ট্রপতি সংবিধান বহির্ভূতভাবে অধ্যাদেশটি জারি করেছেন। প্রজাতন্ত্রের সকল ব্যক্তি সংবিধান মানতে বাধ্য। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। ফলে রাষ্ট্রপতিও সংবিধান লঙ্ঘন করতে পারেন না।
আইনজীবীরা বলেছেন, হাইকোর্টের রায়ে আপাতভাবে রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি করা একটি অধ্যাদেশকে অবৈধ ঘোষণা করা হলে রায়টি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাংবিধানিক গুরুত্ব জড়িত থাকায় রায় অনুযায়ী নির্বাচন বহির্ভূত সকল অধ্যাদেশ আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হলে ফলাফল একই রকম হতে পারে। তাই অন্যান্য অধ্যাদেশের বৈধতাও এখনো আইনগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
গতকাল বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও বিচারপতি আবু তারিক সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ এই অধ্যাদেশকে বেআইনী ঘোষণা করেন। এই রায়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন জড়িত থাকায় সরকার আপিল করতে চাইলে আপিল বিভাগে লীভ টু আপিল দায়ের না করে সরাসরি নিয়মিত আপিল দায়েরের অনুমতি দিয়েছে আদালত।
হাইকোর্ট রায়ে বলেন, সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশে জাতীয় সংসদ কার্যকর না থাকলে বিশেষ জরুরী পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে বলে রাষ্ট্রপতি সন্তুষ্ট হলে অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। অর্থাৎ
সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিশেষ জরুরী অবস্থার সৃষ্টি হলে এবং তার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে রাষ্ট্রপতি সন্তুষ্ট হলে অধ্যাদেশ জারি করতে পারবেন। রাজনৈতিক সরকারের সময় প্রধান বিচারপতি ও প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের বিষয় ছাড়া অপর সকল বিষয়ে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করেন। রাষ্ট্রপতির কাজ রাজনৈতিক সরকারের সময়ই সীমিত। রাজনৈতিক সরকারের সময় রাষ্ট্রপতির সন্তুষ্টির বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর সন্তুষ্টির উপর নির্ভর করে। অপর দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাজ দেশের দৈনন্দিন কাজ পরিচালনা এবং একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কাজ করা। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাষ্ট্রপতির কাজ আরও সীমিত হয়ে পড়ে। অপর দিকে রাষ্ট্রপতির সন্তুষ্টি সংবিধান অনুযায়ী হয়েছে কি না তা বিবেচনার এখতিয়ার উচ্চ আদালতের রয়েছে। অতিপ্রয়োজনীয় বিষয়ে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। অন্যথায় অধ্যাদেশ জারি করা হলে তা হবে এখতিয়ার বহির্ভূত। সংবিধানের কাঠামোর বাইরে কোন বিশেষ মহলের চাহিদা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কার্যক্ষমতার পরিধি বৃদ্ধি করা হলে তা জনগণের ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করবে। কাজী নিয়োগের বিষয়ে দেশে কোন বিশেষ জরুরী অবস্থার সৃষ্টি হয়নি এবং এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের কোন প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়নি। এছাড়া কাজী নিয়োগের বিষয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে সম্পৃক্তও নয়। ফলে রাষ্ট্রপতি সংবিধান অনুযায়ী এ অধ্যদেশটি জারি করেননি।
রায়ে বলা হয়, ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমাদের সংবিধান রচিত হয়েছে। এই সংবিধান একটি মহান দলিল। সংবিধান জনগণের আশা আকাংখার প্রতীক। কোন কর্তৃপক্ষ এই সংবিধান লঙ্ঘন করতে পারে না। এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সকল ব্যক্তি পালন করতে বাধ্য। রাষ্ট্রপতিও সংবিধানের উর্ধ্বে নন। ফলে তিনিও সংবিধান পালন করতে বাধ্য। রাষ্ট্রপতি যদি সংবিধান লঙ্ঘন করেন, তবে প্রজাতন্ত্রের যে কোন ব্যক্তি সুপ্রিমকোর্টের কাছে তার প্রতিকার চাইতে পারেন। বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে যদি সংবিধানের ছোট ছোট বিচ্যুতির বৈধতা দেয়া হয়, তবে এক সময় সংবিধান ধ্বংস হয়ে যাবে।
রিট আবেদনের পক্ষে এডভোকেট কামরুল হক সিদ্দিকী, রাষ্ট্র পক্ষে ডেপুটি এটর্নি জেনারেল ইদ্রিস খান এবং আদালতকে আইনী সহায়তা প্রদান করতে এমিকাসকিউরি হিসেবে ব্যারিষ্টার রফিক উল হক, ব্যারিষ্টার আজমালুল হোসেন কিউসি ও এডভোকেট শামসুদ্দীন চৌধুরী মানিক মামলা পরিচালনা করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন আইনজীবী সাংবাদিকদের বলেন, এর আগেও বিভিন্ন অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। কিন্তু ওই মামলা নিস্পত্তির পূর্বেই সংসদে অধ্যাদেশ পাস করায় তা আইনে পরিণত হয়ে যায়। ফলে মামলা অকার্যকর হয়ে পড়ে। কিন্তু এবারই প্রথম এমন রায় দেয়া হলো। এই রায়ের ফলে বর্তমান সরকারের সময় নির্বাচন ব্যতীত অন্য বিষয়ে জারি করা অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হলে, তাও বাতিল হয়ে যাবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
রিট আবেদনের পক্ষের কেঁসুলী এডভোকেট কামরুল হক সিদ্দিকী বলেন, আদালত কাজী নিয়োগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশকে বেআইনী ঘোষণা করেছেন। ফলে পূর্বে বলবত মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিষ্ট্রেশন আইন অনুযায়ী কাজীদের নিয়োগের বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকবে।
১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিষ্ট্রেশন আইন অনুযায়ী আইন মন্ত্রণালয় কাজী নিয়োগ দিয়ে আসছে। কিন্তু আইন মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে জেলা প্রশাসকের হাতে এই ক্ষমতা দিয়ে গত ২০ ফেব্রুয়ারী অধ্যাদেশ জারি করেন রাষ্ট্রপতি। এই অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মুসলিম ম্যারেজ রেজিষ্ট্রেশন ও কাজী সমিতির সভাপতি পীরজাদা সৈয়দ শরীয়ত উল্লাহসহ ৬ জন হাইকোর্টে গত ১৩ মার্চ একটি রিট আবেদন দাখিল করেন।
প্রসঙ্গত রিট আবেদনের সঙ্গে সাংবিধানিক প্রশ্ন জড়িত থাকা সত্ত্বেও সরকার হাইকোর্টের জারি করা রুলের জবাব দেয়নি। এমনকি রুলের ওপর শুনানিতে এটর্নি জেনারেল উপস্থিত ছিলেন না। হাইকোর্ট রায় প্রদানকালে এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
আপনার মন্তব্য দিন
You must be logged in to post a comment.