16th Jul 2008
গ্যাটকো মামলা তিন মাসের জন্য স্থগিত
কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা কথিত গ্যাটকো মামলার কার্যক্রম তিন মাসের জন্য স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। আদালত একই সঙ্গে এ মামলা দায়ের ও এর কার্যক্রম পরিচালনা করা কেন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করা হবে না, আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে তার কারণ দর্শাতে সরকার ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতি রুল জারি করেছেন। বেগম খালেদা জিয়ার দায়ের করা একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মাশুক হোসেন আহমেদ সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার এই আদেশ দেন। এর আগে ৯ জুলাই একই আদালত বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা নাইকো মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে অনুরূপ আদেশ দিয়েছে।
দুদক হাইকোর্টের ওই আদেশ স্থগিত রাখার আবেদন জানালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার জজ গতকাল সেটিও খারিজ করে দেন। গ্যাটকো মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে আদেশ দানকালে আদালত মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনী প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় আবারো উষ্মা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘কার্য সম্পাদনের ক্ষেত্রে দুদককে স্বচ্ছ হতে হবে।’ আদেশের পর খালেদা জিয়ার কৌঁসুলি ব্যারিস্টার রফিক -উল হক সাংবাদিকদের বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দায়ের করা এ মামলাটির এজাহার, অভিযোগপত্রও আমলে নেয়ার অনুমোদন যথাযথভাবে দেয়নি দুদক। হাইকোর্ট এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মামলাটির কার্যক্রম স্থগিত করেছে।’ তবে দুদকের কৌঁসুলি খুরশিদ আলম খান বলেছেন, ‘সমস্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করেই দুদক এ মামলার অনুমোদন দিয়েছে। আইন মেনেই কাজ করেছে, কোনো ভুল করেনি।’ হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে দুদক সুপ্রিম কোর্টে আপিল করবে বলে তিনি জানান। মামলা দায়ের ও অভিযোগপত্রের জন্য দেয়া অনুমোদন আইনের দৃষ্টিতে কোনো অনুমোদনই নয়’ দাবি করে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক সংক্ষিপ্ত শুনানিতে বলেন, ‘এই অনুমোদন মেকানিক্যাল। সমস্ত ঘটনা পর্যালোচনা করে এই অনুমোদন দেয়া হয়নি। তাই মামলার কার্যক্রম চলতে পারে না।’ তিনি এরশাদ বনাম নির্বাচন কমিশন মামলায় আপিল বিভাগের রায়ের নজির আদালতে উপস্থাপন করে বলেন, কমিশন অর্থ চেয়ারম্যান ও অপর কমিশনারের সমন্বয়ে গঠিত কমিশন। একজন কমিশনারের অনুমোদন কমিশনের অনুমোদন হিসেবে বিবেচিত হবে না। তিনি বলেন, ৬০ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দেয়ার কথা থাকলেও দুদক এ মামলায় ২৫১ দিন পর অভিযোগপত্র দিয়েছে। আদালত বলেছে, ‘আমরা খালেদা জিয়া বা শেখ হাসিনার বিষয় বিবেচনায় আনছি না। আমরা বিবেচনা করছি দুদকের অনুমোদন যথাযথ কি-না। সন্তুষ্টি সাপেক্ষে এ অনুমোদন দেয়া হয়েছে কি-না। আদালত বলেন, ‘একজন কমিশনার হাবিবুর রহমান অনুমোদন দিলেই পুরো কমিশনের অনুমোদন হয় না। প্রতিষ্ঠানকে কার্যসম্পাদনের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে ও স্বচ্ছ হতে হবে।’ আদালতের আদেশের পর খালেদা জিয়ার আরেক কৌঁসুলি জয়নুল আবেদিন সাংবাদিকদের বলেন, দুটি মামলার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যাওয়ায় বেগম খালেদা জিয়ার জামিন লাভে এখন আর কোনো আইনগত বাধা নেই। কেননা, আর কোনো মামলায় চার্জশিট দেয়া হয়নি কিংবা খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার দেখানো হয়নি। শুনানিতে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ছাড়াও জয়নুল আবেদিন, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, ব্যারিস্টার নওশাদ জমির, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, ফেরদৌস আক্তার ওয়াহিদা, শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, এএইচএম মিজানুর রহমান, সালমা সুলতানা সোমা, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, নাজমুল হুদা, রেজাউল করিম রেজাসহ বিপুলসংখ্যক আইনজীবী বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে উপস্থিত ছিলেন। প্রসঙ্গত, বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাঁর বিরুদ্ধে সাজানো গ্যাটকো মামলা দায়ের ও এর কার্যক্রমের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে এ রিট আবেদনটি দায়ের করেন। রিটে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান, কমিশনার মোঃ হাবিবুর রহমান, তিনজন উপ-পরিচালক যথাক্রমে শিরিন পারভীন, গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরী, মোঃ জহিরুল হুদা, দুদক সচিব, সরকারের পক্ষে স্বরাষ্ট্র সচিব ও ঢাকার বিশেষ জজ আদালত ৩ কে বিবাদী করা হয়। গত ১০ জুন বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে রিটের এফিডেভিট করেন এডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিট দাখিলকারী আইনজীবী হলেন ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। রিটে বেগম খালেদা জিয়া প্রাথমিকভাবে নিম্ন আদালতে মামলাটির কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ চাওয়ার পাশাপাশি মামলাটি দায়ের ও এর কার্যক্রম চালিয়ে নেয়াকে কেন অবৈধ ও বেআইনী ঘোষণা করা হবে না- সরকারের কাছে তার কারণ জানতে চাওয়ার জন্য আদালতের কাছে আবেদন করেছেন। রিট আবেদনে বলা হয়েছে, মামলাটি দায়ের ও অভিযোগপত্র দেয়ার জন্য যে অনুমোদন দুর্নীতি দমন কমিশন দিয়েছে তা আইনের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। কারণ সমস্ত ঘটনা পর্যালোচনা করে তা দেয়া হয়নি। তাছাড়া আদালতে অভিযোগপত্র দেয়ার অনুমোদন দিয়েছেন একজন কমিশনার। তাই এ অনুমোদন কমিশনের অনুমোদন নয়। সঠিক ও বৈধ অনুমোদন ছাড়া গ্যাটকো মামলার কার্যক্রম চালানো আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে খালেদা জিয়া রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী যে কাজ করেছেন তা পরীক্ষা করার এখতিয়ার দুদকের নেই বলেও রিটে দাবি করা হয়। এর আগে গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা জরুরি ক্ষমতা আইনের অন্তর্ভুক্ত করার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত বছর ২৭ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেছিলেন খালেদা জিয়া। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট খালেদা জিয়ার জামিন মঞ্জুর করেন। পাশাপাশি গ্যাটকো মামলার কার্যক্রমও স্থগিত করা হয়। এরপর গত বছর ৪ অক্টোবর আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ তিন সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেছিল। পরে দুদক আপিল বিভাগের ওই স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য একটি আবেদন করেন। গত ১৫ জুন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা দুইটি লিভ টু আপিল এবং হাইকোর্টের আদেশের ওপর ইতিপূর্বে দেয়া স্থগিতাদেশ বৃদ্ধির আবেদন এক মাসের জন্য মুলতবি (স্ট্যান্ডওভার) রাখেন।
আপনার মন্তব্য দিন
You must be logged in to post a comment.