16th Jul 2008
সুদানের দারফুর সমস্যা : ইহুদীদের ভূমিকা
দক্ষিণ সুদানের দারফুরকে কেন্দ্র করে চলছে ইহুদী চক্রান্ত। গত মাসে তেলআবীবে দক্ষিণ সুদানের বিদ্রোহীদেরকে উষ্ণ অভিনন্দন জানানো হয়। পূর্ণ আতিথেয়তা প্রদর্শনের সাথে সাথে দারফুরের শরণার্থীদের জন্য সাহায্যেরও ঘোষণা দেয়া হয়। তাছাড়া তেলআবিবের বিদ্রোহীদের অফিস খোলার বিষয়টিও প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। সুদান আজাদী আন্দোলন নামক সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আব্দুল ওয়াহেদ নূর। এসব তৎপতায় এটা স্পষ্ট সুদানকে যুদ্ধ বিধ্বস্ত এলাকা বানাতে ইহুদীরা খুবই সক্রিয়। সুদানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার জন্যও ইহুদী লবী সচেষ্ট। এ জন্য বিদ্রোহী সংগঠনগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে। সুদানের জন্য এটা নতুন নয়। অতীতেও ইসরাইল এ কাজ করেছে। পার্থক্য ইসরাইল বর্তমানে প্রকাশ্যে ময়দানে নেমেছে। এবার পশ্চিম সুদানের বিদ্রোহীদের প্রকাশ্যে সমর্থনই দেয়া হচ্ছে না বরং ইহুদী ভ্রাতৃত্বের কথাও বলা হচ্ছে জোরেশোরে।
ইহুদীরা তাদের জাতীয় সাহায্যকে মানবিক সাহায্য বলতে চায়। তাদের সাহায্য থেকে তারা পূর্ণ ফায়দা নিতে চায়। ইহুদীরা তাদের এই সাহায্যকে মানবিক সহায়তা হিসেবে পেশ করে নিজেদের মানবিক জাতি-হিসেবে প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু এর দ্বারা কি ফিলিস্তিনীদের হত্যাকারীর অভিযোগ থেকে সে রেহাই পাবে?
সুদানের রাষ্ট্রদূত ইহুদীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, দারফুর সমস্যা ইহুদী ষড়যন্ত্রেরই ফল। তেলআবীবে বিদ্রোহীদের অফিস খোলা দারফুর সমস্যাকে আরো জটিল করারই লক্ষণ। সুদানী রাষ্ট্রদূত ইদ্রিস সালমান আরো বলেন, বিদ্রোহী গ্রুপের নেতা আব্দুল ওয়াহিদ নূরকে এর চড়া মূল্য দিতে হবে। বিদ্রোহীদের তেলআবিব অফিস খোলা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এর পটভূমি তৈরি করা হচ্ছিল দীর্ঘদিন থেকে।
বিদ্রোহী গ্রুপ এবং তেলআবিবের সম্মিলিত ষড়যন্ত্রের শিকার আজকের সুদান। ইহুদীরা তিনটি ফন্সন্টে সক্রিয়।
প্রচার মিডিয়ার মাধ্যমে মিথ্যা অপপ্রচার চলছে।
(২) সামরিক সাহায্যের মাধ্যমে দারফুরের বিদ্রোহীদের অস্ত্র সরবরাহ।
(৩) রাজনৈতিক ময়দানে দারফুর সমস্যাকে জটিলতর বানানোর অপচেষ্টা।
ইহুদীরা দারফুরের জন্য নিজের অস্ত্র ভাণ্ডারের দরজা খুলে দিয়েছে। বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন এই ষড়যন্ত্রেরই অংশ। ইউরোপ ও আমেরিকার পার্লামেন্ট সদস্যদেরও উস্কানি দেয়া হচ্ছে। তাদেরকে দিয়ে নিজ নিজ পার্লামেন্টে সুদানের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব উথাপনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বিগত দু’বছর জাতিসংঘে সুদানের বিরুদ্ধে একাধিক প্রস্তাব পাস করানো হয়েছে।
৫ লাখ ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার বিশিষ্ট দারফুর সুদানের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ। এর আয়তন সুদানের মোট আয়তনের ২০ ভাগ। জনসংখ্যা ৬০ লাখ। পেট্রোল, লোহা, ইউরেনিয়াম ও তেলসমৃদ্ধ এলাকা। ছোটখাট বিরোধ উপজাতীয় পর্যায়ে সমাধান করা গেলেও ’৭০ ও ’৮০-এর দশকে শাদ ও লিবিয়ায় যুদ্ধ এই এলাকাকে প্রভাবিত করে। শাদের সাথে সংযুক্ত দারফুরে অস্ত্রের বিস্তার ঘটে। দারফুরের বিরাট সীমান্ত শাদের সাথে সংযুক্ত এবং বেশীর ভাগ এলাকায়ই আসা-যাওয়ার পথ উন্মুক্ত।
দারফুরের গৃহযুদ্ধের উৎপত্তি সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে। কৃষক ও পশু পালকদের সামান্য মতবিরোধ ভয়াবহ রূপ নিলে তা উপজাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। আফিন্সকার উপজাতীয় সরকারদের এই যুদ্ধ আরবীয় ও পশ্চিম আরবীয় যুদ্ধে বিস্তার লাভ করে। ইহুদী সংগঠনগুলো দুনিয়ার সামনে এই সমস্যাকে অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরে। তারা দারফুর সমস্যাকে হলোকষ্টের ঘটনা তাজা করা, ইহুদীদের জন্য সহানুভূতি হাসিল করা এবং ইসরাইলের জন্য চাঁদা সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করে। সুদানের রাষ্ট্রদূতের মতে দারফুর বিদ্রোহীদের নিকট থেকে প্রচুর পরিমাণ ইসরাইলী অস্ত্র উদ্ধার এখানে ইসরাইলের পূর্ণ সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ। জর্দানের গোয়েন্দা সংস্খা এমন এক ইসরাইলী নেটওয়ার্কের তথ্য সংগ্রহ করেছে যারা দারফুর বিদ্রোহীদের ইসরাইলী অস্ত্র সরবরাহে সক্রিয়।
ইহুদী শক্তি দারফুরে অস্ত্রের বৃষ্টি নামাতে চায়। যাতে করে এলাকায় বিশ্ঙ্খৃলা বহাল থাকে এবং বিদ্রোহীদের শক্তি বৃদ্ধি পায়। ইহুদী রাষ্ট্রের উপদেষ্টা দানি ইয়াতুমের দারফুর সমস্যার সংশ্লিষ্টতা এরই অন্যতম প্রমাণ। দানিইয়াতুম মোসাদের সাবেক প্রধান। গ্রেফতারকৃতদের নিকট ইসরাইলী পাসপোর্ট পাওয়া যায়। আমদানি-রফতানি ব্যবসায়ী শিমুল নাওয়ারও বিদ্রোহীদের অস্ত্র সরবরাহে সংশ্লিষ্ট। তেল আবীব শুধুমাত্র বিদ্রোহীদের অস্ত্রই দিচ্ছে না। বরং সুদানের প্রতিবেশী শাদেও অস্ত্র সরবরাহের চুক্তি করেছে।
শাদ বিদ্রোহীদের জন্য অত্যন্ত উর্বর এলাকা। সুদানের বিরুদ্ধে ইহুদীদের যখন সুযোগ মিললো তারা হৈ চৈ শুরু করে দিল, সুদান দারফুরে আফিন্সকী বাসিন্দাদের হত্যা চালাচ্ছে। তারা প্রপাগান্ডা শুরু করল সুদান দারফুরে গণহত্যা শুরু করেছে। দারফুর সমস্যা নিয়ে অভিযান চালানোর জন্য ২০০৪ সালে “দারফুর প্রতিরক্ষা আন্দোলন” কমিশন গঠন করা হয়। দারফুরে গণহত্যা রোধে প্রপাগান্ডা চালানোর জন্য ১৮০টি সংগঠন সক্রিয়, এখানে ইহুদী সংগঠন ছাড়া খৃষ্টান সংগঠনও সক্রিয়। এই সংগঠনের প্রেসিডেন্টের বার্ষিক সম্মানী ৫ লাখ ডলার। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের বার্ষিক সম্মানী সাড়ে চার লাখ ডলারের চেয়েও বেশী। ইহুদী লবী প্রেসিডেন্ট বুশের দ্বারা সুদানের উপর আর্থিক অবরোধ আরোপ করায় সুদানের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ প্রোগ্রামও তাদেরই তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
জাতিসংঘ, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গৃহীত সুদান বিরোধী প্রস্তাব, বিভিন্ন খৃস্টান সংগঠনের সুদান বিরোধী ভূমিকা পালনে ইহুদী লবী খুবই সক্রিয়। ইহুদী লবী আমেরিকার কংগ্রেস এবং হোয়াইট হাউজের উপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছে সুদান বিরোধী ভূমিকা পালন করার জন্য। দারফুর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এখন সুদানের উপর চাপ সৃষ্টি এবং দারফুর সমস্যায় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে সামরিক সমাধানের জন্য তৎপর। যাতে দারফুরে যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। এই সংগঠন আমেরিকার পার্লামেন্ট মেম্বারদের নিকট চিঠি লিখছে এবং ওয়াশিংটনের কেন্দ্রীয় এলাকায় অনবরত প্রতিবাদ মিছিল করে চলছে। প্রচার মাধ্যমকে ব্যবহার করছে পূর্ণমাত্রায়। যার ফলে বিষয়টি বিশ্বসমস্যায় রূপ ধারণ করছে। ফিলিস্তিনীদের উপর ইহুদীদের জুলুম-নির্যাতনকে তারা স্খানীয় সমস্যা বলতে চায় এবং এ ব্যাপারে অন্যকারো নাক গলানো তাদের নিকট অপছন্দনীয়। ফিলিস্তিনের মজলুম, ক্ষুধায় কাতর মানুষের জন্য ইসরাইলের কোন চেতনা নেই। তাদের সবচিন্তা দারফুরের মজলুম মানুষের জন্য। টিভি চ্যানেল এবং সংবাদপত্র দারফুরের ক্ষুধার্ত মানুষের সাহায্যের আবেদনে ভরপুর। দারফুর রক্ষা আন্দোলন ও ওখানকার ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য ফান্ড সংগ্রহ করেছে কিন্তু তা খরচ করা হচ্ছে প্রচার প্রপাগান্ডায়। দারফুর রক্ষা আন্দোলন ২০০৫ সালে দুটি সংগঠন কায়েম করে। যারা সেখানে ব্যাপক হত্যা চালায়।
মানব সেবায় আমেরিকান ইহুদী সংগঠন : ইহুদী হোলো কষ্টি মিউজিয়াম
এই দুই সংগঠনে ৬০-এর অধিক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ কাজ করছেন। বিশ্ব রাজনীতির ব্যাপারে যারা এক্সপার্ট। এর সদর দপ্তরের বার্ষিক বাজেট ১৫ মিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশী। এই বাজেটের বেশীর ভাগ ব্যয় হয় সুদান বিরোধী অভিযান খাতে। ইহুদী গ্রুপ সভ্যকে বিকৃত করে পেশ করার ব্যাপারে খুবই তৎপর। যাতে সুদানের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা যায়। এভাবে তারা বিশ্ববাসীর দৃষ্টি থেকে ইরাক, আফগানিস্তান ও ফিলিস্তিন সমস্যা মুছে দিতে চায়। যেখানে চলছে ইসরাইল ও আমেরিকায় সীমাহীন জুলুম নির্যাতন ও অমানবিক গণহত্যা এবং প্রধান উদ্দেশ্য আরব ও আফিন্সকানদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করা। কারণ ফিলিস্তিনীদের অধিকারের ব্যাপারে বেশীর ভাগ আফ্রিকান রাষ্ট্রই সহানুভূতিশীল। ইসরাইল, আরব ও আফিন্সকান দেশসমূহের সম্পর্কে চিড় ধরাতে চায়। ইসরাইল প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে দারফুরে আফিন্সকান মুসলমানরা আরব মুসলমানদের খতম করছে। সুদানের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ডক্টর মোস্তফা ওসমান দারফুরে ইসরাইলী ষড়যন্ত্রের কয়েকটি নমুনা পেশ করেছেন। ইসরাইলী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনৈক দায়িত্বশীল ব্যক্তির শাদ সফরকালে হাবশী ইহুদীদের নেতা হাশিম কুশী মিডিয়াকে বলেন, আমরা প্রভুর শোকরিয়া আদায় করছি, ইসরাইল আফিন্সকী ভাইদের সাথে আছে। আমরা সেদিনের অপেক্ষায় আছি যে দিন আফিন্সকার আকাশে ইসরাইলের তারা জ্বলবে। ইহুদীদের একটি ওয়েব সাইটে বলা হয়, দারফুর সমস্যা প্রকট হওয়ার পর থেকে শাদ ইহুদীদের অন্যতম বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ইসরাইল যেখানে নিজের পা মজবুত করতে চায়। নাইজেরিয়ার পূর্বাঞ্চলে ইসরাইল এ মাউ জামায়াতের সহযোগী। নাইজেরিয়া স্বাধীন হলে বায়াফন্সাল্লাসে নতুন গণতন্ত্র কায়েম হয়। ইসরাইল বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত গণতন্ত্রের কথা বলে এমাউকে সমর্থন দেয়। ইহুদী সংগঠনসমূহ দারফুর প্রকাশ্যে সুদান বিরোধী অভিযানে তৎপর। শুরুতে তারা ছিল পর্দার অন্তরালে। এখন প্রকাশ্য ভূমিকায় তৎপর। ২০০৫ সালে একটি আমেরিকান ইহুদী সংস্খা ‘দারফুর গণহত্যা বìধ কর’ শীর্ষক সম্মেলনের আয়োজন করে। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীগণ শক্ত ভাষায় সুদানের সমালোচনা করেন। এই সম্মেলনে সুদানকে আন্তর্জাতিক আদালতের সম্মুখীন করার দাবী জানানো হয়। এটা গণহত্যা বন্ধের জন্য আমেরিকান সেনা অভিযানের কথা বলা হয়। ‘দারফুর রক্ষা কর’ সংগঠন সংগৃহীত চাঁদা দারফুরবাসীদের না দিয়ে মিডিয়া অভিযানে ব্যয় করে। এর বার্ষিক বাজেট দেড় কোটি ডলার। মিডিয়া অভিযানে সুদানের সাথে চীনকেও টার্গেট করা হয়। তার ফলও দেখা যায়। চীন দারফুর বিষয়ে সুদানের ভূমিকার নিন্দা করে। ফিলিস্তিনী ও আরবদের সহায়তা আফ্রিকীদের নিকট অপছন্দনীয়। প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বারাক ওবামা সুদানে আরো নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং দারফুর রক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশের সেনা মোতায়েনের জন্য প্রেসিডেন্ট বুশের নিকট দাবী জানান। ইহুদী ও খৃস্টান মিশনারীগণ সুদানের বিরুদ্ধে অভিযানে তৎপর। বিশ লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই অঞ্চল ইহুদী ও খৃস্টানদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। দারফুর সমস্যার পর শাদকে ইহুদী কেন্দ্র বানানো হয়। ইহুদীরা ওয়াশিংটন দারফুরকে ভালবাসে’ শিরোনামে অভিযান চালায়। এই অভিযানে চাঁদ সংগ্রহ করা হয়। ২০০৬ সালের ২৮ এপ্রিল প্রতিবাদ সমাবেশে বুশ বক্তব্য রাখেন। এরপর আমেরিকায় ১৭টি শহরে সুদানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়। কৃষ্ণবর্ণের ইহুদীদের নেতা হাশিমকুশী ইসরাইলে টিভির সাথে সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা প্রভুর শোকরিয়া আদায় করছি ইসরাইল, আফ্রিকী ভাইদের সাহায্য করছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস অদূর ভবিষ্যতে এই এলাকায় ইসরাইলী পতাকা উড্ডীন হবে।” এর দ্বারা একথা পরিষ্কার, সুদানের বিদ্রোহীদের সাহায্যের ব্যাপারে ইসরাইল মূল ভূমিকা পালন করছে। এর সাথে আরব ও আফিন্সকানদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টির সাথে সাথে ইহুদীদেরকে বিশ্ববাসীর জন্য কল্যাণকামী হিসেবে প্রমাণ করতে চায়।
আপনার মন্তব্য দিন
You must be logged in to post a comment.