16th Jul 2008

মাওলানা নিজামী মুক্ত

লাখ লাখ ফুলের পাপড়ি শত পুষ্প স্তবকে সিক্ত হয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী যখন অযুত নিযুত অনুরাগীর মাঝে ফিরে এলেন তখন তার জীবন থেকে কেটে গেছে ৫৮ দিন। ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা গ্যাটকো মামলায় জামিন পেয়ে গতকাল মঙ্গলবার স্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে মাওলানা নিজামী বন্দি জীবন থেকে মুক্ত হাওয়ায় ফিরে এলেন। গত ১৮ মে রোববার রাতে মগবাজারের বাসা থেকে যখন পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছিল তখন মাওলানা নিজামী জাতির উদ্দেশে বলেছিলেন, “আমি নির্দোষ, আমি মজলুম, সত্যের বিজয় একদিন হবেই”­এই  কথাটিই গতকাল তার মুক্তির পর কঠিন সত্যতে পরিণত হলো। নেতাকর্মী সমর্থক আর লাখো অনুরাগীর মাঝে মাওলানা নিজামী ফিরে এলেন বিজয়ীর বেশে। এ সময় জনতার শ্লোগান ছিল- “জায়াল হাক্ক”। উচ্চ আদালতের মাধ্যমে তিনি মামলা থেকে জামিন পেয়ে পিজি হাসপাতালের ভিআইপি কেবিন থেকে মুক্ত হয়ে বাসায় ফেরেন অযুত নিযুত ভক্ত অনুরাগীর সমন্বয়ে। এর আগে কারা কর্মকর্তারা তার জামিনের আদেশনামাটি হাতে পান।

গতকাল দুপুর থেকেই তার মুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করে কারা কর্তৃপক্ষ। জামিনের সংবাদ পেয়েই দুপুরের পর থেকে শত শত নেতাকর্মী ভক্ত অনুরাগী পিজি হাসপাতালের কেবিন ওয়ার্ডের গেটে ভিড় জমায়। এক সময় তা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। এ সময় সবার হাতে ছিল ফুল, পাপড়ি আর ফুলের স্তবক। মাওলানা নিজামী পিজি হাসপাতালের ভিআইপি কেবিন থেকে বের হয়ে আসার পর উপস্খিত সবাই ফুল পাপড়ি ছিটিয়ে তাকে বরণ করে নেন। এ সময় মাওলানা নিজামী হাত নেড়ে তাদের ভালোবাসার জবাব দেন।

 

 

মাওলানা নিজামীকে নিয়ে গাড়ির বহরটি মগবাজারের উদ্দেশে রওনা করে ৬টা ৪৮ মিনিটে গন্তব্যে এসে পৌঁছে ৮টা ১২ মিনিটে। দীর্ঘ এ সময় লেগেছে মাত্র কয়েক মিনিটের পথ পাড়ি দিতে।

১৮ মে রোববার রাতে ৪ প্লাটুন পুলিশের একটি দল মাওলানা নিজামীকে গ্রেফতার করে। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ক্যান্টনমেন্ট থানা হেফাজতে। থানায় রাত যাপনের পর তাকে পরদিন ১৯ মে সোমবার ঢাকার সিএমএম আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তার জামিন না মঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠায়। কারাগারে তাকে ডিভিশন প্রদান করে রাখা হয় কারা হাসপাতালের পাশে অবস্খিত দ্বিতল ভবনের দোতলার একটি বিশেষ সেলে। এই সেলে মাওলানা নিজামী ২৬ মে পর্যন্ত অবস্খান করেন। এরপর ২৬ মে দুপুরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় চম্পাকলি সেলে। এই সেলে থাকাবস্খায় তিনি অসুস্খ হয়ে পড়লে তাকে ২৯ জুন কারা কর্তৃপক্ষ পিজি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠান। কারা কর্র্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে পিজি হাসপাতালে কেবিন ওয়ার্ডের ভিআইপি কেবিনের ২১০ নং রুমে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখান থেকেই গতকাল মুক্তি পেয়ে বের হয়ে বাসায় ফেরেন।

ডিআইজি প্রিজন্স মেজর শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, যদি দ্বিতীয় কোন মামলা থাকতো এবং তাকে শ্যোন এ্যারেস্ট দেখানো হতো তাহলে কিন্তু আমাদের পক্ষে জামিন দেয়া সম্ভব হতো না। এমন কোন তথ্যও আমাদের কাছে নেই। উনি মাত্র একটা মামলার জন্য এ্যারেস্ট ছিলেন বলে আমরা জানি এবং আজকে বিকেল সোয়া ৬ টার দিকে উনার জামিননামা পেয়ে তাকে মুক্তি দেই।

যেভাবে মুক্তি পেলেন:

গত সোমবার হাইকোর্ট আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে মুক্তি দেয়ার আদেশ দেয়ার পর জামিননামা নিয়ে সরকার পক্ষের আইনজীবীর কাছে যাওয়া হয়। মাওলানা নিজামীর আইনজীবী এডভোকেট মশিউল আলম দৈনিক সংগ্রামকে জানান, সরকার পক্ষের আইনজীবী এডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল মাওলানা নিজামীর জামিননামা গ্রহন করে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেন। পরে আমরা বিশেষ আদালতের বিচারক শাহেদ নুরুদ্দীনের আদালতে গেলে আদালত বিকেল ৪ টার দিকে জামিননামা গ্রহণ করেন। অফিসিয়াল প্রসেস হতে হতে ৫ টা বেজে যায়। ৬ টায় জামিননামার কপি ডিআইজি প্রিজন্সের কাছে পৌঁছে বলে তিনি জানান।

মাওলানা নিজামীর মুক্তির সংবাদ পেয়ে লাখ লাখ নেতাকর্মী জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় অফিস, পিজি হাসপাতাল এবং শাহবাগের রাস্তায় জড়ো হয়। পিজি হাসপাতালের গেট থেকে শেরাটন হোটেলের মোড় পর্যন্ত নেতাকর্মীরা ফুল নিয়ে দুই সারিতে দাঁড়িয়ে থাকে। সাড়ে ৬ টায় জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মুজিবুর রহমান হাসপাতালের কেবিনে প্রবেশ করে মাওলানা নিজামীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। ৬ টা ৩৫ মিনিটে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা, এটিএম আজহারুল ইসলাম, ঢাকা মহানগরীর আমীর মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, সেক্রেটারি হামিদুর রহমান আযাদ পিজি হাসপাতালের ভিআইপি কেবিনে আমীরে জামায়াতের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ৬ টা ৪০ মিনিটে জামিননামার কপি নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ আসলে নেতৃবৃন্দ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন। কেবিন থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে নেতাকর্মীরা ফুলের মালা দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায়ই তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। দেশবাসীর দোয়ায় ও আইনি প্রক্রিয়ায় আমি মুক্তি পেয়েছি। দেশবাসীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

মাওলানা নিজামীকে নিয়ে কেবিন থেকে বের হওয়ার পর পিজি হাসপাতালের সামনে লাখো মানুষ তাকে ফুলের শুভেচ্ছা জানান। তিনি গাড়ির মধ্যে দাঁড়িয়ে জনতার উদ্দেশে হাত নাড়েন। এ সময় গাড়ির সামনে বসা ছিলেন ঢাকা মহানগরীর আমীর মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, সেক্রেটারি হামিদুর রহমান আযাদ ও সহকারী সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম বুলবুল এবং গাড়ীতে পেছনে দাঁড়ানো ছিলেন শিবির সভাপতি মুহাম্মদ জাহিদুর রহমান। রাস্তায় লোকজন আমীরে জামায়াতকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানায়। তখন নামাজের সময় হলে লোকজন রাস্তায় দাঁড়িয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করেন। আমীরে জামায়াতও গাড়ির মধ্যে মাগরিবের নামায আদায় করেন। এ সময় তার সাথে ছিলেন সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা, এটিএম আজহারুল ইসলাম। পরে গাড়িতে করে শেরাটন হোটেলের সামনে দিয়ে ইউটার্ন করে শাহবাগ মোড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সামনে দিয়ে কাকরাইল হয়ে মগবাজার মোড় দিয়ে রাত সোয়া ৮ টায় কেন্দ্রীয় অফিসে আসেন। গোটা রাস্তা লাখ লাখ নেতা কর্মী হেঁটে কেন্দ্রীয় অফিস পর্যন্ত আসেন।

কেন্দ্রীয় অফিসে জনতার ঢল:

প্রিয় নেতা মুক্তি পাবেন এ জন্য দুপুরের পর থেকেই মগবাজারস্খ জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মী ও সাধারণ জনতা ভিড় জমায়। সোয়া ৮ টায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পৌঁছলে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর মকবুল আহমদের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ তাকে স্বাগত জানান। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্খিত ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মাওলানা রফিউদ্দিন আহমদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবু তাহের, কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি তাসনীম আলম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ইজ্জতুল্লাহ, মাওলানা এটিএম মাসুম, কেন্দ্রীয় অফিস সেক্রেটারি মাযহারুল ইসলাম প্রমুখ। নেতৃবৃন্দ আমীরে জামায়াতকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন।
গাড়ি থেকে নেমেই মাওলানা নিজামী কেন্দ্রীয় অফিসের তার রুমে যান। এ সময় একে একে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ তার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
এরপর আসেন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম। তিনি স্নেহভাজন উত্তরসূরীর জন্য নিজ বাসা থেকে বেলী ফুল নিয়ে আসেন। একগুচ্ছ ফুল তিনি তার হাতে দেন। মাওলানা নিজামী সবার মাঝে ফুল ছিটিয়ে দেন। তারপরই আসেন মাওলানা নিজামী জেলে থাকা অবস্খায় ভারপ্রাপ্ত আমীরের দায়িত্ব পালনকারী সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা আবুল কালাম মোহাম্মদ ইউসুফ। মাওলানা নিজামী সাড়ে ৯ টার দিকে অফিস থেকে বাসায় যান।

যে মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন মাওলানা নিজামী:

দুর্নীতির মাধ্যমে ঢাকার কমলাপুর অভ্যন্তরীন কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) ও চট্টগ্রাম বন্দরে এককভাবে গ্লোবাল এগ্রোটেড কোম্পানিকে (গ্যাটকো) হ্যান্ডলিংয়ের কাজ পাইয়ে দেয়ার অভিযোগে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর দুদক উপ-পরিচালক গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরী বাদী হয়ে খালেদা জিয়াসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় মামলা দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বেআইনিভাবে অনুমোদন দিলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ গ্যাটকোর অনুকূলে কার্যাদেশ প্রদান করে। গ্যাটকোর অনভিজ্ঞতা ও অদক্ষতার কারণে ঢাকা আইসিডি এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সংরক্ষিত এলাকার আইসিডির কনটেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম বিভিন্ন সময়ে বিঘিíত ও বিলম্বিত হয়। কনটেইনারের জট লাগে, ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। ফলে রাষ্ট্রের প্রায় এক হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতিসাধন হয়। ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারের আর্থিক ক্ষতিসাধন করে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারায় অপরাধমূলক অন্যায় করেছেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে তাদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জনগুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় জরুরি বিধিমালা ২০০৭-এর বিধি নম্বর ১৫ ও ১৯ (ঞ) মোতাবেক অনুমোদন করা হয়।

আপনার মন্তব্য দিন

You must be logged in to post a comment.