16th Jul 2008
এ কে পার্টির ভাগ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা
-মোতালেব জামালী
তুরস্কের ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) নিষিদ্ধ করার যে আইনি লড়াই চলছে তার প্রতি এখন মুসলিম বিশ্বের দৃষ্টি নিবদ্ধ। একটি ক্ষমতাসীন দলকে নিষিদ্ধ করার জন্য যখন সরকারি কৌঁসুলিরাই আদালতে আবেদন করেন তখন এর শেষ পরিণতি দেখার জন্য স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে কৌতূহল জাগে। তুরস্কে এ রকম একটি নজিরবিহীন ঘটনারই অবতারণা করেছেন দেশটির শীর্ষস্থানীয় একজন সরকারি কৌঁসুলি।
ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বজায় রাখার নামে তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মুসলিম মেয়েদের স্কার্ফ পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল অনেক আগে থেকেই। একেপি আগাম নির্বাচনের মাধ্যমে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর এই নিষেধাজ্ঞাটি তুলে নেয় পার্লামেন্টে আইন পাস করে। সরকারের যুক্তি ছিল, এটি মুসলিম মেয়েদের ধর্মীয় স্বাধীনতার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভের অধিকারের পথে একটি বড় বাধা। সে কারণে এই বাধাটি আইনগতভাবেই দূর করা হয়েছে। কিন্তু তুরস্কের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির সমর্থকরা দাবি করছেন, একেপি নেতা প্রধানমন্ত্রী রিসেপতাইপ এরদোগানের সরকার স্কার্ফের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মাধ্যমে মূলত দেশে ইসলামি শাসনব্যবস্থা কায়েমের গোপন লক্ষ্য বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। আর এর মাধ্যমে একেপি সরকার দেশের দীর্ঘদিনের অনুসৃত ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বিলুপ্ত ঘটাতে চায় বলে অভিযোগ তুলেছে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধের জের ধরে দেশব্যাপী ব্যাপক সভা-সমাবেশের মাধ্যমে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টাও চলে। এতে সফল না হয়ে শেষ পর্যন্ত একেপি নিষিদ্ধ করার জন্য মামলা ঠুকে দেয়া হয়। গত মার্চ মাসে তুরস্কের সাংবিধানিক আদালতে দেশটির প্রধান সরকারি কৌঁসুলি আবদুর রহমান ইয়ালসিনকায়া এ কে পার্টি নিষিদ্ধ করার আবেদন জানিয়ে মামলাটি দায়ের করেন। ১১ জন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত সাংবিধানিক আদালতের প্রধান বিচারক ওসমান পাকসুট গত বৃহস্পতিবার বলেছেন, তারা আগামী মাসের (আগস্ট) প্রথমার্ধেই মামলার রায় ঘোষণা করবেন। সরকারি কৌঁসুলিরা এ কে পার্টির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগে বলেছেন,
প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুল ও প্রধানমন্ত্রী এরদোগানসহ এ কে পার্টির সব নেতাই সাবেক রেফাহ পার্টি বা ওয়েলফেয়ার পার্টির সদস্য। বন্ধ করে দেয়া ওই দলটি ইসলামি রাজনীতির ধারক-বাহক ছিল। এ কে পার্টি ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ওয়েলফেয়ার পার্টির কর্মসূচি গোপনে বাস্তবায়নের চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। তারা তুরস্ককে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত করতে চায় যা দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। স্কার্ফের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার একেপি’র ইসলামি এজেন্ডা বাস্তবায়নের গোপন চেষ্টারই অংশ। এসব অভিযোগ প্রমাণের জন্য সরকারি কৌঁসুলিরা এরদোগান ও আব্দুল্লাহ গুলসহ অন্যান্য একেপি নেতার অতীতের বিভিন্ন বক্তব্যের পেপার কাটিংসহ নানা প্রমাণ আদালতে পেশ করেছেন। সরকারি কৌঁসুলিরা প্রায় ২ হাজার ৫০০ পৃষ্ঠার নথিপত্র আদালতের কাছে জমা দিয়েছেন তাদের উত্থাপিত অভিযোগের সপক্ষে।
আদালতে এ কে পার্টির পক্ষে লড়ছেন দলের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও উপপ্রধানমন্ত্রী সিমেল সিসেক ও দলের সংসদীয় উপনেতা বাকির বোজদাগ। তারা সরকারি কৌঁসুলিদের বক্তব্যের পাল্টা যুক্তি হিসেবে আদালতে বলেন, একেপি’র বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের আসলে কোনো আইনি ভিত্তি নেই। এটি আসলে একটি আদর্শিক লড়াই। দেশের ৪৭ ভাগ মানুষের সমর্থন নিয়ে একেপি দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসেছে। অন্য দিকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা পেয়েছে ২০ শতাংশ মানুষের সমর্থন। একেপি’র প্রতি ক্রমবর্ধমান জনসমর্থনে ভীত হয়েই ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে এ দলকে নিষিদ্ধ করতে চায় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা। একেপি ইসলামি আদর্শে বিশ্বাসী হলেও দেশের মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতাকে কোনোভাবেই লঙ্ঘন করেনি। একেপি’র সংবিধানেও ধর্মনিরপেক্ষ নীতির প্রতি দলের দৃঢ় সমর্থনের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর একেপি আগের ওয়েলফেয়ার বা রেফাহ পার্টির ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য গঠন করা হয়নি। এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন দল। এ দলটি দেশের প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেও হুমকির সম্মুখীন করেনি। প্রচলিত সমাজব্যবস্থার জন্যও এ দল কোনো হুমকি হিসেবে দেখা দেয়নি। কাজেই এ কে পার্টি কোনোভাবেই দেশের সংবিধান ও আইনবিরোধী কোনো কাজ করেনি, যে জন্য এ দলকে নিষিদ্ধ করা যেতে পারে।
আদালতে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলেই আগামী মাসের প্রথমার্ধে রায় দেবে আদালত। এ ক্ষেত্রে এ কে পার্টির জন্য একটি বিশেষ সুবিধাজনক বিষয় হচ্ছে ২০০২ সালে কুর্দিপন্থী কুর্দিস রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমস পার্টি (হাক-পার) নিষিদ্ধ করার জন্য সাংবিধানিক আদালতে আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু গত জানুয়ারি মাসে দেয়া রায়ে আদালত দলটি নিষিদ্ধ করার আবেদন খারিজ করে দেয়। এদিকে ইউরোপের ইতিহাসেও রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার নজির তেমন একটা নেই। ১৯৫০-এর দশক থেকে ইউরোপের ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, ওই সময় থেকে এ পর্যন্ত মাত্র তিনটি দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১৯৫২ সালে জার্মানির নাৎসিবাদী সোস্যালিস্ট পার্টি এবং ১৯৫৬ সালে জার্মান কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ করা হয়। এর পর সর্বশেষ স্পেনে ২০০৩ সালে হেরি বাতাসুনা পার্টি নিষিদ্ধ করা হয় বাসু বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ ইটিএ’র সাথে গোপন সম্পর্ক থাকার অভিযোগে। এই তিনটি ঘটনা ছাড়া ইউরোপের কোনো দেশে আইনগতভাবে কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। এ কে পার্টি ইউরোপের ইতিহাসে নিষিদ্ধের তালিকায় যোগ হবে কি না সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি।
১৯৬০-এর দশক থেকেই তুরস্কের রাজনীতির নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে সামনে অগ্রসর হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি রক্ষার নামে দেশটির সামরিক বাহিনী বারবার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে। ধর্মনিরপেক্ষতার স্বঘোষিত রক্ষক এই শক্তিশালী বাহিনীর শীর্ষ জেনারেলরা তুরস্কের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে বারবার ব্যাহত করেছে। ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান রক্ষার নামে তারা ১৯৬০, ১৯৭১ ও সর্বশেষ ১৯৯৭ সালে নাজমুদ্দিন আরবাকানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এবারো এ কে পার্টির সরকারকে একই কায়দায় ক্ষমতাচ্যুত করার গোপন পরিকল্পনা নেয়া হলেও তা ফাঁস হয়ে যায়। সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা ছাড়াও এরগেনেকন নামের একটি উগ্র জাতীয়তাবাদী সংগঠনের সদস্যরা এই চক্রান্তে জড়িত। গত সপ্তাহে দুই সাবেক শীর্ষ জেনারেলসহ এই সংগঠনের ২১ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। সরকারি গোয়েন্দারা এখন এই সংগঠনের তৎপরতা সম্পর্কে তদন্ত করছেন। একেপি’র প্রতি বিপুল জনসমর্থন থাকার কারণে জেনারেলরা সামরিক অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা থেকে কিছুটা সরে এসে এখন আইনগতভাবে দলটিকে নিষিদ্ধ ও সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়ায় জড়িত হয়েছে। আর এতে সহযোগিতা করছে বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য সংস্থার ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা। সংবিধান আদালতে একেপি’র নিষিদ্ধ করার মামলা এরই প্রতিফলন।
শেষ পর্যন্ত এ কে পার্টির ভাগ্যে কি ঘটবে তা অনুমান করা কঠিন। যদি নিষিদ্ধ করা হয় তাহলে তুরস্কের রাজনীতি আবারো বড় ধরনের হোঁচট খাবে। দলটি নিষিদ্ধ করা হলে প্রধানমন্ত্রী এরদোগানসহ একেপি’র অন্তত ৪০ জন নেতাকে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করা হতে পারে। অবশ্য প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুল এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকতে পারেন। কারণ তিনি দল থেকে পদত্যাগ করে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। ফলে তিনি একেপি’র অন্য নেতাদের মধ্য থেকে একজনকে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করে নতুন সরকার গঠনের পদক্ষেপ নিতে পারেন। আর দলের নামও পরিবর্তন করে নতুন নামে যাত্রা শুরু করবে। ফলে তুরস্কে ইসলামি রাজনীতির বিকাশ রুদ্ধ করা সম্ভব হবে না সেনাবাহিনীও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের পক্ষে।
আপনার মন্তব্য দিন
You must be logged in to post a comment.