20th Jul 2008
এফএম রেডিও এবং অজানা এক শোকগাথা
<<< যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সিতে এডউইন আর্মস্ট্রং এফএম টাওয়ার।
১৯৩৪ সালের দিকে বিশ্বের বেশিরভাগ অঞ্চলেই চলছিল বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দা। বেকারত্ব তখন জেঁকে বসেছিল মহামারীর মতো। অনেক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসায় টিকে থাকার জন্য মরিয়া হয়ে তখন লড়তে হয়েছিল। এই অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়েনি এমনি একটি শিল্প ছিল রেডিও শিল্প। এই অর্থনৈতিক মন্দার সময়েও যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রচার কোম্পানিগুলো প্রতিবছর শত শত কোটি ডলার আয় করে। তাদের এই সাফল্যের পেছনে অবদান ছিল এডউইন আর্মস্ট্রং নামের এক মেধাবী জনের আবিষ্কার। এই মন্দার ২০ বছর আগে তিনি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় উন্নীত করেন রেডিও রিসিভারের সেনসিটিভিটি ও কোয়ালিটি। কলেজের ছাত্র থাকার সময় তিনি যে ‘রিজেনা রেডিও সার্কিট’ উদ্ভাবন করেন, সে সুবাদেই তিনি রেডিওর সেনসিটিভিটি ও কোয়ালিটি বাড়িয়ে তুলতে সক্ষম হন। তার পর তিনি আরো এগিয়ে গিয়ে উদ্ভাবন করেন ‘সুপার রিজেনারেটিভ সার্কিট’ এবং ‘সুপার হিটারোডাইন রিসিভার’। এই উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে কার্যত বেতার সম্প্রচারে সাফল্যের ভিত রচিত হয়। আসলে আজকের দিনে আমরা যেকোনো রেডিওই কিনিনা কেন, সেগুলোতে এসব উদ্ভাবনাকে কাজে লাগানো হয়েছে। কিন্তু ১৯৩৩ সাল আর্মস্ট্রং সম্প্রচার ব্যবসায়ে আনেন আরেক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তিনি উদ্ভাবন করেন এফএম রেডিও।
এ ধরনের চমকপ্রদ কারিগরি ও প্রাযুক্তিক সাফল্য অর্জনের পরও এসব উদ্ভাবন থেকে তিনি তেমন কোনো আর্থিক সুবিধা লাভে সক্ষম হননি। তার অনেক অসাধারণ ধারণাই লুটে নিয়ে যায় বিবেকবর্জিত কিছু মানুষ। এ প্রবণতার পথ ধরেই অপরিণত বয়সে আর্মস্টংয়ের বিয়োগান্তক মৃত্যু ঘটে।
আর্মস্ট্রং প্রযুক্তি সমস্যার প্রথম শুরু ১৯২২ সালে। তখন তিনি প্যাটেন্ট আইনের মামলায় হেরে গিয়ে তার রিজেনারেটিভ সার্কিটের স্বত্ব হারান। খপপ উপ ঋসড়পঢ়য় নামের এক ব্যক্তি ১৯১৬ সালে একই উদ্ভাবনার প্যাটেন্ট লাভ করেন। এর দুই বছর আগে এই প্যাটেন্ট মঞ্জুর করা হয়েছিল আর্মস্ট্রংকে, তখন তিনি এ প্যাটেন্ট বিক্রি করে দেন ‘এটি অ্যান্ড টি’ নামের আমেরিকার কোম্পানির কাছে। এর পরপরই শুরু সুদীর্ঘ তিক্ত আইনি লড়াই। এ লড়াই শেষ পর্যন্ত সে দেশের সুপ্রিমকোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। বিচারক কারিগরি বিবেচ্যগুলোর মর্মোপলব্ধি করতে না পেরে বিচারক ডি ফরেস্টের পক্ষে রায় ঘোষণা করে আর্মস্ট্রংয়ের কাছ থেকে তার উদ্ভাবনার প্যাটেন্ট ছিনিয়ে নেয়। বিজ্ঞানী সমাজ নিশ্চিত ছিলেন এর উদ্ভাবক ছিলেন আর্মস্ট্রং। তারপরও আর্মস্ট্রং আদালতের লড়াইয়ে প্যাটেন্ট লাভ করতে বিফল হন। রিজেনারেটিভ সার্কিটের উদ্ভাবক হিসেবে প্যাটেন্ট লাভ করতে আর্মস্ট্রংকে ২১ বছর ধরে আইনি লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। এ সময় ১৩ কোর্টের ১৩ জন বিচারক এ ব্যাপারে ১৩টি রুলিং দেন।
এভাবে চলল আর্মস্ট্রংয়ের আইনি লড়াই, অপর দিকে চলল উদ্ভাবনার কাজও। তিনি সে সময় শুরু করেন ‘স্ট্যাটিক প্রবলেম’-এর কাজ। এই স্ট্যাটিক প্রবলেম প্রথম দিকের বেতার সম্প্রচারের ক্ষেত্রে ছিল এক অভিশাপস্বরূপ। আর্মস্ট্রংয়ের সহকর্মীরা মনে করতেন এই ‘স্ট্যাটিক প্রবলেম’ কখনোই সমাধান হবে না। তারপরও আর্মস্ট্রং তার গবেষণা অব্যাহত রাখেন। সে সময় রেডিওর সম্প্রচার চলত এএম বা এমপ্লিচুড মডুলেশনের মাধ্যমে। এই এএম পরিবর্তন আনে রেডিও তরঙ্গে। এর ফলে রেডিও সিগন্যাল আরো বৃহত্তম পরিসরে পৌঁছানো সম্ভব হলেও শব্দমান ছিল খুবই খারাপ।
আর্মস্ট্রং রেডিও ওয়েবের ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তন না করেই সিগন্যাল মানের উন্নয়ন সাধন করতে প্রয়াসী হন। তিনি ফ্রিকোয়েন্সি মডুলেশন [এফএম] রেডিও উদ্ভাবন করে এ কাজটি করেন। তিনি এফএম রেডিওর প্যাটেন্ট লাভ করেন ১৯৩৩ সাল। পরের বছর তিনি তার প্রথম ফিল্ড টেস্ট সম্পাদন করেন। তখন তিনি এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে অর্গান বাজিয়ে তা এএম ও এফএম সিগন্যালে সম্প্রচার করেন। এএম সম্প্রচারে ছিল স্ট্যাটিক প্রবলেম। কিন্তু এফএম সম্প্রচারে শব্দ ছিল সুস্পষ্ট ও মানসম্পন্ন। রেডিও শ্রোতারা স্ট্যাটিক প্রবলেমে খুব ত্যক্ত-বিরক্ত ছিল। পরে পরীক্ষার পর পরীক্ষা চালিয়ে তিনি শব্দমানের উন্নয়ন ঘটান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগে আর্মস্ট্রং সফলভাবে লঞ্চিং করেন। এফসিসি’র সাথে ৪২ ও ৫০ মেগাহার্টজের একটি এফ ব্রডকাস্ট স্পেকট্রাম সৃষ্টির জন্য। তিনি নির্মাণ করেন একটি পরীক্ষামূলক স্টেশন ও ৪১০ ফুট উঁচু একটি টাওয়ার। নিউ জার্সির আলপাইনের নির্মিত এ স্টেশন ও টাওয়ারের পেছনে খরচ ৩ লাখ ডলার। তিনি নিউ ইংল্যান্ডে ণথষরপপ ঘপয়াসড়র নামের একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এফএম স্টেশন ছোট নেটওয়ার্ক চালু করেন। সেখানে রিসিভার উৎপাদন করতে শুরু করেন ব্রডকাস্ট পিকআপ করার জন্য। যারা এই নেটওয়ার্ক শুনেছেন তারা শব্দের প্রশংসা করেছেন। এ ব্রডকাস্ট গোটা মানবজাতির কাছে পৌঁছানো যেত ৫০ ও ১৫ হাজার সাইকেলে। অপর দিকে এএম সররবরাহ করেছিল ৫ হাজার সাইকেল। এফএম রেডিও সম্পর্কে আগ্রহীদের একটি ক্লাব গঠিত হয় নিউইয়র্কে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগে আগে। এ ক্লাব ‘এফএম’ নামে একটি ম্যাগাজিন চালু করে। আর্মস্ট্রং কিন্তু কঠোর সাধনা করে চলেন এফএম রেডিওর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য। তা ছাড়া তিনি কাজ করেন এটুকু প্রমাণ করতে যে, এফএম ডুয়াল চ্যানেল ট্রান্সমিশনও সক্ষম। তা স্টেরিও সাউন্ডের উপযোগী। এফএম-এর এই সক্ষমতাকে কাজে লাগানো যাবে আলাদা দু’টি নন-স্টেরিও প্রোগ্রাম পাঠানোর কাজে, কিংবা মাল্টি প্লেক্সিং নামে প্রক্রিয়ায় ফ্যাক্স ও টেলিগ্রাফ মেসেজ একযোগে পাঠানোর কাজেও ব্যবহার করা যাবে। এমনকি তিনি একটি এফএম সিগন্যাল চাঁদের দিকেও ছুঁড়ে মারেন, যা এএম সিগন্যালের মাধ্যমে পাঠানো সম্ভব নয়।
টেলিভিশন-পূর্ব সময়ে অবশ্যই এএম রেডিও ছিল একটা বড় কাজ এবং অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তি চেয়েছিলেন বিষয়টি এমনিতেই থেকে যাক। উদ্ভাবন তাদের জন্য খুব লাভই সৃষ্টি করবে বলে এরা ধরে নিয়েছিলেন। তখন রেডিও মিডিয়ায় আরসিএ’র প্রতিষ্ঠাতা উথংমন ঝথড়ষসফফ-এর বেশি প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। তিনি এখন পরিচিত ছিলেন ‘দ্য জেনারেল’ নামে। স্নারনফ তখন রেডিওর সব কারিগরি বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতেন। তিনি গড়ে তুলেছিলেন এনবিসি ও এটিসি টেলিভিশন নেটওয়ার্কস। তিনি ছিলেন প্রথম দিককার টেলিভিশনের সমর্থক। তিনি টেলিভিশনের জন্য চলতি এনটিএসসি স্ট্যান্ডার্ড ও ডেভেলাপ করেন, সে স্ট্যান্ডার্ড আমরা ৬০ বছর ধরে ব্যবহার করছি।
এফএম রেডিও যাতে তার কোম্পানির আয়কে হুমকির মুখে না দিতে পারে সে জন্য এফএম রেডিওকে ধ্বংস করে দেয়ার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে স্নারনফ কোম্পানি সফল লবিং চালায় এফসিসি’র কাছে। এর মাধ্যমে এ কোম্পানি আর্মস্ট্রং ফ্রিকোয়েন্সি থেকে আসা এফএম স্পেকট্রাম লাভ করতে চায়। ৮৮ থেকে ১০৮ মেগাহার্টজের এই এফএম স্পেকট্রামই আজকের দিনে আমরা ব্যবহার করছি। এই তৎপরতার ফলে শিগগিরই আর্মস্ট্রংয়ের ইয়াঙ্কি নেটওয়ার্ককে অচল করে দেয়। সেই সাথে অচল হয় উৎপাদিত সব এফএম রেডিও সেট। তখন স্টেশনগুলো যন্ত্রপাতি দিয়ে পুনঃসজ্জিত করা খুবই ব্যয়বহুল ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এফসিসি’র রুলিংয়ে বলা হয় নতুন টেলিভিশন ব্রডকাস্টের জন্য ৪০ মেগহার্টজ ব্যান্ড ব্যবহার করতে হবে। এতে আরসিএ’র বেশ অর্থ বিনিয়োগ ছিল। আরসিএ’র মিত্রতা ছিল এটিঅ্যান্ডটি’র সাথে। এটিঅ্যান্ডটি ইতোমধ্যে সমর্থন জানিয়েছিল ফ্রিকুয়েন্সি মুভের প্রতি। কারণ এফএম রিলে স্টেশনগুলোর লোকসান ইয়াঙ্কি নেটওয়ার্ক স্টেশনকে বাধ্য করেছিল এটি অ্যান্ড টি থেকে তার যুক্ত লিঙ্ক কিনতে। এভাবেই এফএম রেডিও সম্প্রচারে সীমাহীন বাধার পাহাড় গড়ে তোলা হলো।
পরিস্থিতি আরো খারাপের দিক গেল, যখন আর্মস্ট্রং আরসিএ ও এনবিসি’র সাথে নতুন করে প্যাটেন্ট লড়াইয়ে নামলেন। আরসিএ ও এনবিসি কোনো রয়ালটি পরিশোধ না করেই তরঙ্গ এফএম প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিল। জটিল আকারের নতুন আইনি লড়াই করতে গিয়ে বাড়তি খরচের বোঝা চাপল ইয়াঙ্কি নেটওয়ার্কের ওপর। এতে এর অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠল। এফএম মামলার দখলে আর্মস্ট্রংয়ের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ল, মানসিকভাবেও তিনি বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেন। তার ৩১ বছর বয়েসী স্ত্রী এসব ব্যক্তিগত ও আর্থিক অভিঘাত সহ্য করতে না পেরে ১৯৫৩ সালের নভেম্বরে আর্মস্ট্রংকে ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমান। আরসিএ’র বড় মাপের অর্থশক্তির কাছে মার খেল আর্মস্ট্রংয়ের আইনি প্রতিরক্ষা। এক সময় আর্মস্ট্রং কপর্দকশূন্য হয়ে পড়েন। তিনি একা হয়ে গেলেন। হয়ে পড়লেন অনেকটা উন্মাদগ্রস্ত। ১৯৫৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তার লাশ পাওয়া গেল তার অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের পাঁচতলার বর্ধিতাংশের ছাদের ওপর। প্রবল হতাশা তার বেঁচে থাকাটাকেই করে তুলেছিল অর্থহীন। সে জন্য তিনি ১৩তলা নিউইয়র্ক সিটি অ্যাপার্টমেন্টের জানালা দিয়ে রাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে এভাবেই হিংসা আর লোভের পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। তিনি এ পথ বেছে নিয়েছিলেন এই ভেবে যে, তিনি ব্যর্থ হয়ে গেছেন, এফএম রেডিও আর কখনোই তার গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।
আর্মস্টংয়ের মৃত্যুর পর টেলিভিশনের জনপ্রিয়তা রেডিওর সোনালি দিনগুলো শেষ করে দেয়। কিন্তু শ্রোতারা ধীরে ধীরে এক সময় জানতে পারল এফএম রেডিওর স্পষ্টতই মিউজিক্যাল হাই ফিডালিটি এএম রেডিওর তুলনায় উন্নততর। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে তাই রেডিওগুলোতে এএম ব্যান্ডের পাশাপাশি এফএম ব্যান্ডও সন্নিবেশিত হতে লাগল। ১৯৭০-এর দশকে এসে এফএম ব্যান্ডের শ্রোতা সংখ্যা এএম ব্যান্ডের রেডিওর শ্রোতা সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যায়। সেই থেকে এই শ্রোতা সংখ্যার পার্থক্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। আজকের দিনে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ২ হাজারেরও বেশি এফএম রেডিও স্টেশন সম্প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের বাংলাদেশে এখন বেশ কয়েকটি এফএম রেডিও স্টেশন সফলভাবে চালু রয়েছে। আরো কয়েকটি চালু হওয়ার পথে। মোবাইল ফোনে কিংবা এফএম রেডিও সেটে বর্ধিত হারে চলছে এমএফ ব্যান্ডের সম্প্রচার। সাধারণত এফএম সিগন্যাল ব্যবহার হয় মাইক্রোওয়েব লিঙ্ক ও মহাকাশ যোগাযোগের জন্য। এডউইন আর্মস্টংয়ের এ উদ্ভাবনা স্পষ্টতই বদলে দিয়েছে রেডিও জগৎটাকে। তার এ উদ্ভাবন আজ আমাদের সহজ বিনোদনের এক নিত্যসঙ্গী। কিন্তু তার বিয়োগান্তক মৃত্যুর কথা মনে পড়লে এফএম রেডিওর যাবতীয় আনন্দটাই যেন মাটি হয়ে যেতে চায়। তিনি আজ বেঁচে থাকলে তার স্বপ্নের সেই আনন্দ আমরা তার সাথে ভাগাভাগি করতে পারতাম নিশ্চিত।
-গোলাপ মুনীর
আপনার মন্তব্য দিন
You must be logged in to post a comment.