23rd Jul 2008
বান্ধবীর সহায়তায় স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা করেন চিকিৎসক স্বামী
মিরপুরে নাজমা হত্যার ঘটনায় স্বীকারোক্তি
মিরপুরে গৃহবধূ নাজমা হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। পঙ্গু হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডাঃ তোজাম্মেল হোসেন বান্ধবী নার্গিসকে নিয়ে স্ত্রী ফাহমিদা আক্তার নাজমাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। গ্রেফতারকৃত ডাঃ তোজাম্মেল ও নার্গিস নাজমা হত্যাকাণ্ডের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো ঘটনা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের নিকট স্বীকার করেছে। জানা গেছে, বিকৃত মানসিকতার ডাঃ তোজাম্মেল প্রাইভেট প্র্যাকটিস ও পঙ্গু হাসপাতাল থেকে রোগী দালালের মাধ্যমে ভাগিয়ে নেয়ার বাণিজ্য করে লাখ লাখ টাকা উপার্জন করে নারীদের পিছনে ব্যয় করতেন। তার নির্যাতনের শিকার অনেক মহিলা রোগী এবং ৫ জন নার্স। মহিলা রোগীদের সংখ্যা দুই ডজন হবে। প্রাইভেট চেম্বারে মহিলা রোগীদের সঙ্গে দৈহিক মেলামেশা করতেন তোজাম্মেল। ডিবির কর্মকর্তারা নাজমা হত্যা মামলা তদন্ত করতে গিয়ে এবং ডাঃ তোজাম্মেল ও নার্গিসের স্বীকারোক্তিতে এসব তথ্য পেয়েছেন। এদিকে নাজমা হত্যাকাণ্ডে নার্গিসের স্বামী তিতাসের হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির একই ঘটনায় গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে জেলহাজতে রয়েছে।
পুলিশ ও আত্মীয়-স্বজন জানায়, ১৯৯৩ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুলস্না থানার লালপুর পাগলা এলাকার মরহুম আবদুল হামিদের কন্যা নাজমাকে ডাঃ তোজাম্মেল বিয়ে করেন। এটা তার দ্বিতীয় বিয়ে। প্রথম স্ত্রী পরনারী আসক্ত ডাঃ তোজাম্মেলকে ১৫ বছর আগে তালাক দেন। নিহত নাজমা ডিগ্রী পাস করেছিল। তার পিতা নগদ ২ লাখ টাকা, স্বর্ণালংকারসহ ১০ লাখ টাকার মালপত্র বিয়ের সময় ডাঃ তোহাম্মেলকে যৌতুক হিসাবে দিয়েছিলেন। একজন ডাক্তার জামাই পাওয়ার আশায় তিনি এই টাকা ব্যয় করেন। কয়েক বছর নাজমার দাম্পত্য জীবন ডাক্তার স্বামীর ঘরে মোটামুটি ভালো কাটলেও অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর নারী আসক্ত ডাঃ তোজাম্মেলের আসল রূপ ধরা পড়ে। নাজমার পেটের সন্তান ডাঃ তোজাম্মেলের চাপের মুখে নষ্ট করে ফেলে। এরপর আর নাজমার সন্তান হয় না। এক পর্যায়ে ডাঃ তোজাম্মেলের পরনারী আসক্তির বিষয়টি নাজমার নিকট ধরা পড়ে যায়। শুরু হয় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব। প্রায়ই ডাঃ তোজাম্মেল স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতন করতেন।
যেভাবে ডাঃ তোজাম্মেল স্ত্রীকে খুন করেন
গত ৭ জুলাই পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সকালে বান্ধবী নার্গিস মিরপুর মনিপুর বাসা থেকে ডাঃ তোজাম্মেলের ২ নম্বর সেকশনের এ বস্নকের ৫ নম্বর লেনের বাসায় যায়। তারা প্রথমে নাজমার হাত পা বেঁধে ফেলে মুখে কাপড় ঢুকিয়ে দেয়। এরপর ডাঃ তোজাম্মেল চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে নাজমাকে হত্যা করে। তারা লাশ বাথরুমে ফেলে বাসার দরজার বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে বের হয়ে যায়। পরে রাত ১১টায় প্রাইভেট প্র্যাকটিস শেষে বাসায় প্রবেশের আগে ডাঃ তোজাম্মেল প্রতিবেশীদের ডাকাডাকি করে জানান, তার বাসায় কিছু একটা হয়েছে। সংবাদ পেয়ে মিরপুর থানার পুলিশ সেখানে যায়। পুলিশের উপস্থিতিতে ডাঃ তোজাম্মেল বাসার দরজা খুলে দেন। পুলিশ বাথরুম থেকে নাজমার ড়্গতবিড়্গত মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠায়। বাসার দুইটি চাবিই ডাঃ তোজাম্মেলের নিকট ছিল।
ডাঃ তোজাম্মেল পুলিশকে জানায়, তার নিকট বাসার একটি চাবি ও আরেকটি তার স্ত্রীর নিকট থাকে। সন্দেহ হওয়ায় ডাঃ তোজাম্মেলের দেহ তলস্নাশী করে বাসার ২টি চাবিই তার নিকট থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। তাকে গ্রেফতার করে মিরপুর থানায় নিয়ে যায়। নাজমা হত্যাকাণ্ডে ডাঃ তোজাম্মেলকে আসামি করে মিরপুর থানায় মামলা দায়ের করা হয়। পরে পুলিশ ডাঃ তোজাম্মেলের বন্ধু ও নার্গিসের স্বামী হুমায়ুন কবিরকে গ্রেফতার করে। পরে নাজমা হত্যা মামলার তদন্তভার ডিবির নিকট ন্যস্ত করা হয়। ডিসি (ডিবি) মাইনুল হাসানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে নাজমা হত্যা মামলার তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হয়।
১৭ই জুলাই নার্গিসকে ডিবি পুলিশ গ্রেফতার করে। পরদিন তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে ডিবির কর্মকর্তারা নার্গিসকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। সে হত্যাকাণ্ডের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরা ঘটনা এবং ডাঃ তোজাম্মেলের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক গড়ে উঠার কাহিনী প্রকাশ করে দেয়। ডাঃ তোজাম্মেল একইভাবে ডিবির নিকট স্ত্রী হত্যাকাণ্ডের পুরো তথ্য প্রকাশ করেন।
আমের ঝুড়িতে লাশ ঢাকার বাইরে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল
পরিকল্পনা অনুযায়ী নাজমাকে হত্যা করার পর তার লাশ গুম করার কথা ছিল। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হত্যার দিন কোন এক ফাঁকে ডাঃ তোজাম্মেল তিনটি বড় আমের ঝুড়ি বাসায় এনে রেখে দেন। নাজমার লাশ টুকরা টুকরা করে তিনটি আমের ঝুড়িতে করে গাবতলী থেকে নাইট কোচে ঢাকার বাইরে পাঠিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ঐ দিন নাজমা তার বোনের সঙ্গে ডাক্তার দেখাতে যাওয়ার কথা ছিল। বিকেল পর্যন্ত নাজমা তার বোনের সঙ্গে যোগাযোগ না করায় তাদের সন্দেহ হয়। এই অবস্থায় আত্মীয়স্বজন বিভিন্ন জায়গায় নাজমার সন্ধান চালান। অভিভাবকদের এই তৎপরতার কারণে ডাঃ তোজাম্মেল নাজমার লাশ গুম করার সুযোগ পায়নি। গ্রেফতারকৃত নার্গিসের বাসা থেকে ডিবি পুলিশ হত্যার সময় ব্যবহৃত রক্তমাখা রুমাল ও নাজমার মোবাইল ফোন উদ্ধার করে।
ডাঃ তোজাম্মেলের আরো নানা কুকীর্তি
রাজধানীর গ্রীন সুপার মার্কেটে ডাঃ তোজাম্মেলের প্রাইভেট চেম্বার। এখানে বেলা ২টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসেন। সন্ধ্যার পর মিরপুর বুশরা ক্লিনিকে প্রাইভেট প্র্যাকটিস ও অপারেশন করেন। প্রতি শুক্রবার মানিকগঞ্জ শহরে যান। সেখানে কয়েকটি ক্লিনিকে অপারেশন করেন। তার চেম্বারে আগত মহিলা রোগী ও দর্শনার্থীরা ছিল ডাঃ তোজাম্মেলের টার্গেট। মহিলা রোগী মোটামুটি সুন্দরী হলে ডাঃ তোজাম্মেল তাদের সঙ্গে প্রথমে গল্প ও বিভিন্ন ধরনের আলাপ শুরু করেন। এক পর্যায়ে ফি নেয়া বন্ধ করে দেন। আপ্যায়ন করান। এইভাবে মহিলা রোগী ও দর্শনার্থীর সঙ্গে তিনি দৈহিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তার সঙ্গে প্রায় দুই ডজন মহিলা রোগী এবং অনেক দর্শনার্থী মহিলার অবৈধ সম্পর্ক থাকার তথ্যপ্রমাণ পেয়েছে তদন্তকারি কর্তৃপড়্গ। ৫ জন নার্সের সঙ্গে ডাঃ তোজাম্মেলের অবৈধ সম্পর্ক থাকার তথ্য পায় ডিবি পুলিশ।
কে এই নার্গিস
২০০৪ সালে নার্গিস ডাঃ তোজাম্মেলের চেম্বারে যায়। ঐ সময় নার্গিসের হাঁটুতে ব্যথা ছিল। নার্গিসকে দেখে ডাঃ তোজাম্মেল কোন ফি নেননি। কয়েক দফা চেম্বারে যাতায়াতকালে একদিন প্রাইভেট চেম্বারে ডাঃ তোজাম্মেল নার্গিসের সঙ্গে দৈহিক মেলামেশা করেন। এরপর থেকে তাদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠে। ডাঃ তোজাম্মেল সকালে বাসা থেকে বের হন এবং রাত ১১টায় বাসায় ফেরেন। বেলা ২টার পর হাসপাতাল থেকে বের হয়ে চেম্বারে চলে যান। স্ত্রী নাজমাকে মাসিক খরচ বাবদ তিন হাজার টাকা দিতেন। তার বাসার পরিবেশ খুবই নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর। ডাঃ তোজাম্মেলের মাসিক আয় কয়েক লাখ টাকা। এই টাকা নারীদের পিছনে ব্যয় করতেন বলে পুলিশ তথ্য পেয়েছে। পরনারী আসক্তের প্রতিবাদ করাই নাজমা হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ বলে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। -।। আবুল খায়ের ।।
২৪ তারিখের খবর>>>>>>>>
মৃত্যু নিশ্চিত করতে ডা. তোজাম্মেলঃ স্ত্রীর নাকে ফুটন্ত পানি ঢালেন
ডাক্তার তোজাম্মেল হাত-পায়ের রগ কেটে স্ত্রী নাজমাকে হত্যা করেছেন। মৃত্যু নিশ্চিত করতে তার নাকের ভেতর ফুটন্ত গরম পানি ঢালা হয়। হত্যাকাণ্ডে সহায়তাকারী তোজাম্মেলের পরকীয়া প্রেমিকা সামসুন্নাহার নার্গিস আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে এ কথা বলেছেন। নিহত ফাহমিদা আক্তার নাজমার মোবাইল ফোনটি পুলিশ নার্গিসের বাসা থেকে উদ্ধার করেছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্র জানায়, গত ৬ জুলাই ডাক্তার তোজাম্মেল হোসেন নিজ বাসা মিরপুর ২ নম্বর সেকশনের এ ব্লকের ৫ নম্বর লেনের ১ নম্বর বাসায় স্ত্রী নাজমাকে হত্যা করেন। হত্যার পর ডাক্তার তোজাম্মেল এবং তার বিয়াই মোঃ হুমায়ুন কবিরকে আসামি করে মিরপুর মডেল থানায় একটি মামলা করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশ নাজমার হারানো মোবাইল ফোনটি পূর্ব মনিপুরের ১২৮৭/২/১ নম্বর বাসা থেকে উদ্ধার করে। ওই বাসার চতুর্থ তলায় নার্গিস বসবাস করতেন। নার্গিস হচ্ছেন তোজাম্মেলের বড় ভাইয়ের শ্যালিকা। গ্রেফতারের পর নার্গিস আদালতকে জানান, গত ৫ জুলাই তিনি ৫ হাজার টাকার জন্য পঙ্গু হাসপাতালে ডাক্তার তোজাম্মেলের কাছে যান। তোজাম্মেল পর দিন সকালে তার বাসায় যাওয়ার কথা বলেন। পর দিন সকালে নার্গিস ওই বাসায় গেলে তোজাম্মেল তাকে ৫ হাজার টাকা দেন। এ সময় তোজাম্মেল তার বাম গাল ধরে টান দেন। এই দৃশ্য দেখে নাজমা নার্গিসকে গালাগালি করে। এক পর্যায়ে তোজাম্মেল গিয়ে স্ত্রী নাজমাকে মারতে মারতে মাটিতে শুইয়ে ফেলেন।
তোজাম্মেলের নির্দেশে তখন নার্গিস শার্ট দিয়ে নাজমার হাত-পা বেঁধে ফেলেন। এর পর তার দু’পা ধরে বাথরুমের মধ্যে নেয়া হয়। এ সময় রান্নাঘর থেকে নার্গিস বটি এনে তোজাম্মেলের হাতে দেয়। তোজাম্মেল সেই বটি দিয়ে নাজমার দু’ পায়ের রগ কাটেন। পরে মৃত্যু নিশ্চিত করতে তার নাক দিয়ে গরম পানি ঢালা হয়। এতে নাজমার মুখমণ্ডল ঝলসে যায়। পরে ডাক্তার এবং নার্গিস মিলে ঘটনাটি ডাকাতি বলে সাজানোর জন্য ঘরের আসবাবপত্র এলোমেলো করে ফেলেন। তোজাম্মেল তার নিহত স্ত্রীর মোবাইল ফোনটি নার্গিসের হাতে তুলে দেন। নার্গিস ফোনটি নিয়ে কাপড়ে পেঁচিয়ে ঘরের আলমারির মধ্যে রেখে দেন। গোয়েন্দা পুলিশ ওই মোবাইল ফোনের সূত্র ধরেই নার্গিসকে গ্রেফতার করে। নার্গিস জানিয়েছেন, ২০০৫ সাল থেকে ডাক্তার তোজাম্মেলের সাথে তার অবৈধ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারা দু’জনে প্রায়ই একত্রে কাটাতেন। এ নিয়ে এর আগেও নাজমার সাথে তোজাম্মেলের ঝগড়া বিবাদ হয়। -নিজস্ব প্রতিবেদক।
আপনার মন্তব্য দিন
You must be logged in to post a comment.