23rd Jul 2008
ভারতীয় সংসদের ইতিহাসে কালো দিন
লোকসভায় আস্থা ভোটে কোটি টাকা নিয়ে হাজির বিজেপি সদস্য
লোকসভায় ঘুষের টাকা প্রদর্শন করছেন এক সদস্য - এএফপিআস্থা ভোটে জেতার জন্য টাকা দিয়ে সংসদ সদস্য কেনা-বেচার অভিযোগ উঠছিলই। মঙ্গলবার ভারতীয় সংসদে সেই ঘুষের টাকা নিয়ে বিজেপির এক সংসদ সদস্য হাজির হতেই যাকে বলে তুঙ্গে উঠলো শোরগোল। বিজেপির এক সংসদ সদস্য অশোক আরগল, ১ লাখ টাকার ১০০টি বান্ডিলভর্তি ব্যাগ নিয়ে সরাসরি হাজির ইন লোকসভায়। অভিযোগ মঙ্গলবার সকালেই তার দিলিস্নর ৪ নম্বর ফিরোজ শাহ রোডের বাড়িতে সমাজবাদী পার্টি নেতা অমর সিংহের নির্দেশে এক ব্যক্তি ওই টাকা দিয়েছেন। বক্তব্য, তিনি ও তার সতীর্থ আরো দুই বিজেপি সাংসদ যাতে আস্থা ভোটে গরহাজির থাকেন, তার জন্য মোট ৯ কোটি টাকা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। তার মধ্যে অতিরিক্ত বা অ্যাডভান্স বাবদ এ ১ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। পুরো ঘটনাটি এক সংবাদ চ্যানেলের স্ট্রিং অপারেশনে ক্যামেরাবন্দি করে রাখা হয়েছে বলেও বিজেপির ওই সাংসদ লোকসভায় জানান। আর এরপরই টাকার বান্ডিল সভার মধ্যে তুলে ধরে অবিলম্বে বিষয়টির হেস্তনেস্ত করার দাবিতে বিজেপির সঙ্গে সুর মেলান বামপন্থী এবং বিএসপি সাংসদরাও। লোকসভায় তখন অধ্যক্ষের চেয়ারে ছিলেন উপাধ্যক্ষ চরণজিৎ সিং আটওয়াল। বিষয়টি তার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে সভায় আসেন অধ্যক্ষ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু তিনিও বিরোধীদের সমবেত প্রতিবাদের মুখে দাঁড়াতে না পেরে আস্থা ভোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশে সভার কাজ মুলতবি করে চলে যান।
আর এরপরই উত্তাল হয়ে ওঠে সাংসদীয় রাজনীতি। অবিলম্বে অভিযোগকারী বিজেপি সাংসদ সদস্য অশোক আরগলের নার্কো টেস্টের মাধ্যমে রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি জানান ইউপিএ নেতা, তথা রেলমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব। বিরোধী দলনেতা লালকৃষ্ণ আদভানি তখন দাবি করছেন গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি দেখতে হবে যতোক্ষণ না মীমাংসা হবে ততোক্ষণ আস্থা ভোট করা চলবে না, কারণ সরকারের বিরুদ্ধেই টাকা বা ঘুষ দিয়ে সমর্থন কেনার অভিযোগ উঠেছে। বিজেপির সভাপতি রাজনাথ সিংহ আরেক ধাপ এগিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করেন। সিপিএমের প্রকাশ কারাটরা ঘটনাটিকে সংসদীয় ইতিহাসে কালো দিন বলে অভিহিত করেন। পুরো পর্বে কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী দলের ক্রাইসিস ম্যানেজারদের নিয়ে বৈঠক করলেও শান্ত দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রীকে।
অবস্থা সামাল দিতে একদিকে ঘটনার তদন্ত করতে দিলিস্নর পুলিশ কমিশনারকে সংসদে ডেকে পাঠান অধ্যক্ষ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। পাশাপাশি পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করতে ডাকা হয় সর্বদলীয় বৈঠকও। টিভি চ্যানেলের কাছে ঘুষ দেয়ার ঘটনার ছবি থাকায় কোনো রাজনৈতিক দলই বিষয়টি উড়িয়ে দিতে পারেনি। পরে মুলতবি শেষে অধ্যক্ষ ঘটনাকে দুর্ভাগ্যজনক এবং লোকসভার পক্ষে কালো দিন বলে বর্ণনা করেন। সোমনাথ বাবু সংসদ সদস্যদের আশ্বাস দিয়েছেন, দোষী কাউকে ছাড়া হবে না। আর এ শাস্তি দেয়ার ব্যাপারটা আমার ওপর ছেড়ে দিন। সত্যি যদি হয় নজিরবিহীন শাস্তি হবে।
অধ্যক্ষ যা-ই আশ্বাস দিন না কেন, মঙ্গলবার বিকালের আস্থা ভোট পর্ব ভারতীয় সংসদে কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইলো। এর আগে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি বঙ্গারু লক্ষ্মণ ঘুষ নিয়েছেন- ক্যামেরাবন্দি হয়েছিল। তারও আগে সরকার বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও ও বুটা সিং ঝাড়খ মুক্তি মোর্চার সাংসদ শৈলেন্দ্র মাহাতো ও শিবু মোরেনকে কয়েক কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। তা নিয়ে বিস্তর হইচইও হয়েছিল। কিন্তু ‘ঘুষের কোটি টাকা’ সরাসরি সংসদে নিয়ে আসার ঘটনা এই প্রথম ঘটলো।
প্রশ্ন উঠেছে, এতো টাকা নিয়ে একজন সংসদ সদস্য সংসদে ঢুকলেন কী করে? নিরাপত্তারক্ষীরা কি করছিল? আর আস্থা ভোট অধিবেশনের সকালে না বলে, বিকালে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য পেশের আগে বিষয়টিকে প্রকাশ্যে আনলো কেন বিজেপি? - পার্থ মুখোপাধ্যায় কলকাতা থেকে।
আপনার মন্তব্য দিন
You must be logged in to post a comment.