26th Jul 2008

শিল্পায়নের বড় বাধা বাণিজ্যিক ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার

০ সর্বনিম্ন ৬ শতাংশে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশে ঋণ দেয়া হচ্ছে

০ বিএবি বলছেঃ মুনাফার উপর কর্পোরেট ট্যাক্স কমালে সুদের হারও কমানো সম্ভব

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অতি মুনাফার আশায় ঋণের সুদের হার কমাচ্ছে না। শিল্পায়নের ক্ষেত্রে উচ্চ সুদের হার অন্যতম বাধা হলেও ব্যাংকগুলোকে এ হার কমিয়ে আনতে রাজি করানো যায়নি। অথচ ব্যাংকগুলো মুনাফার একটি অংশ ছাড় দিলে সুদের হার অনেক কমে যাবার কথা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ বরাবর উপেক্ষিত থেকে গেছে। গ্রাহকদের কাছ থেকে কম হার সুদে আমানত নিয়ে বেশি সুদে ঋণ দেয়ার প্রবণতার প্রতিযোগিতায় নেমেছে প্রায় সকল বাণিজ্যিক ব্যাংক।

প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশেস্নষণ করে দেখা যায়, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মুনাফার পরিমাণ প্রতিবছরই পালস্না দিয়ে বেড়েছে। কিন্তু ব্যাংকগুলো সে অনুপাতে তাদের ঋণের সুদের হার কমায়নি। কোন কোন ক্ষেত্রে সুদের হার বাড়ানো হয়েছে। অপরদিকে আমানতের ঋণের সুদের হারও কিছু কিছু ক্ষেত্রে কমিয়ে দিয়েছে ব্যাংকগুলো।

মার্কেন্টাইল ব্যাংক ২০০১ সালে নীট মুনাফা করেছে ২১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। ২০০৬ সালে এ মুনাফা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকায়। ব্যাংকটি সাড়ে ৭ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ সুদে গ্রাহকদের ঋণ দিয়েছে। যমুনা ব্যাংক ২০০৩ সালে মুনাফা করেছে ৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা। ২০০৬ সালে তাদের মুনাফা পৌঁছেছে ২৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকায়। ব্যাংকটি গ্রাহকদের কাছ থেকে ৬ শতাংশে আমানত গ্রহণ করে সর্বোচ্চ সাড়ে ১৬ শতাংশে ঋণ দিয়েছে। ইসলামী ব্যাংক ২০০১ সালে প্রায় ৪০ কোটি টাকা নীট মুনাফা করলেও ২০০৬ সালে তাদের মুনাফার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪০ কোটি টাকায়। তবে ইসলামী ব্যাংক সুদের হার বেঁধে দেয় না। তারা ইসলামী শরীয়ার ভিত্তিতে নিজস্ব পদ্ধতিতে হিসাব কষে। এ কারণে সুদের হার কমানো-বাড়ানোর বিষয়টি এক্ষেত্রে পরিষ্কার নয়। প্রাইম ব্যাংক ২০০১ সালে ৪৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা নীট মুনাফা করেছে। ২০০৬ সালে তা ১০৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ব্যাংকটি সর্বনিম্ন ৬ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়েছে। প্রিমিয়ার ব্যাংক ২০০১ সালে সোয়া ৬ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। ২০০৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭ কোটি টাকায়। ব্যাংকটি সর্বনিম্ন সাড়ে ৬ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ ১৭ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়েছে। ওয়ান ব্যাংক ২০০১ সালে ৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। ২০০৬ সালে তাদের মুনাফার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকায়। ব্যাংকটি সর্বনিম্ন ৮ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ সাড়ে ১৬ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়ে থাকে। ন্যাশনাল ক্রেডিট এন্ড কমার্স ব্যাংক লিঃ (এনসিসিবিএল) ২০০১ সালে ২৩ কোটি ২২ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। ২০০৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ কোটি ৯২ লাখ টাকায়। ব্যাংকটি গ্রাহকদের কাছ থেকে সর্বনিম্ন ৬ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ ১৭ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়েছে। ন্যাশনাল ব্যাংক লিঃ ২০০১ সালে ২৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। ২০০৬ সালে মুনাফা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ কোটি ৭৪ লাখ টাকায়। ব্যাংকটি সর্বনিম্ন ৬ শতাংশ সুদে আমানত গ্রহণ করে, কিন্তু সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়। মিউচুয়্যাল ট্রাস্ট ব্যাংকের মুনাফা ২০০৩ সালে ১৯ কোটি টাকা। ২০০৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ কোটি ৪২ লাখ টাকায়। ব্যাংকটি সর্বনিম্ন সাড়ে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ সুদে গ্রাহকদের ঋণ দেয়। রূপালী ব্যাংক ২০০১ সালে ৮ কোটি ১৮ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। ২০০৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকায়। ব্যাংকটি সর্বনিম্ন সাড়ে ৪ শতাংশে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ সাড়ে ১৩ শতাংশে টাকা ধার দিয়ে থাকে। পূবালী ব্যাংকের মুনাফা ২০০১ সালে ছিল ৪০ কোটি ৭২ লাখ টাকা। ব্যাংকের মুনাফা বেড়ে ২০০৭ সালে ৬০ কোটি ৩৯ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকটি সোয়া ৫ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়। ট্রাস্ট ব্যাংক লিঃ ২০০৩ সালে ৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। ২০০৭ সালে ব্যাংকটির মুনাফা ১২ কোটি ৩২ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকটি সর্বনিম্ন ৭ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ ১৭ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়ে থাকে। সাউথ ইস্ট ব্যাংক ২০০৭ সালে ৪৪ কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে। তারা ৬ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ সুদে টাকা ধার দেয়। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ২০০৭ সালে ১২ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। তারা সর্বনিম্ন ৭ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়ে থাকে। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ২০০৭ সালে ৫২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। ব্যাংকটি সর্বনিম্ন ৬ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়ে থাকে। উত্তরা ব্যাংক ২০০৬ সালে ২৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। ব্যাংকটি ৬ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ সাড়ে ১৪ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়ে থাকে। আইএফআইসি ব্যাংক ২০০৭ সালে ২৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। তারা ৬ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ সাড়ে ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়ে থাকে। ডাচ বাংলা ব্যাংক ২০০৭ সালে ২১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। তারা সর্বনিম্ন ৬ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়। ইস্টার্ন ব্যাংক ২০০৭ সালে মুনাফা করেছে ২৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা। তারা সর্বনিম্ন সাড়ে ৫ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে। ব্যাংক এশিয়া ২০০৭ সালে ২৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। তারা সর্বনিম্ন ৭ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশে ঋণ দিয়ে থাকে। ব্র্যাক ব্যাংক ২০০৭ সালে ২১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। তারা সর্বনিম্ন সাড়ে ৫ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ সাড়ে ১৭ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে। সিটি ব্যাংক ২০০৭ সালে মুনাফা করেছে ৩৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। তারা সর্বনিম্ন সাড়ে ৬ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়। ঢাকা ব্যাংক ২০০৭ সালে ২৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। তারা সর্বনিম্ন সাড়ে ৬ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ ১৭ শতাংশ সুদে টাকা ধার দেয়। এবি ব্যাংক লিঃ ২০০৭ সালে ১৩০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। তারা সর্বনিম্ন ৭ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়ে থাকে। বিদেশী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবস্থাও একই। এসব ব্যাংক সর্বনিম্ন ৩ শতাংশ সুদেও আমানত নিয়ে থাকে। তারা সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়ে থাকে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ৪ থেকে ৬ শতাংশ সুদে আমানত নেয়। তারা ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়ে থাকে।

এ বিষয়ে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)-এর চেয়ারম্যান নজরম্নল ইসলাম মজুমদার বলেন, কয়েকটি ব্যাংক ইতিমধ্যে সুদের হারের সর্বোচ্চ ধাপ ১৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। বাকিগুলো চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ব্যাংকের মুনাফার ওপর আরোপিত কর্পোরেট ট্যাক্সের হার কমিয়ে আনলে আমরা সুদের হারও কমিয়ে আনতে পারবো। বর্তমানে এ ট্যাক্সের হার ৪৫ শতাংশ, আমরা তা ৪০ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি করেছি।

-।। সাইদুল ইসলাম ।।

আপনার মন্তব্য দিন

You must be logged in to post a comment.