27th Jul 2008
বসনিয়ার মুসলিম ছিটমহল সেব্রেনিচায় সার্বদের গণহত্যা
সার্ব বিদ্রোহী নেতা রাদোভান কারাদজিচ গ্রেফতার হওয়ায় বসনিয়ার নির্যাতিত মুসলমানরা সন্তুষ্ট হয়েছে। তাদের মনে এখন এ বিশ্বাস ফিরে আসছে যে, বিলম্বে হলেও মূল যুদ্ধাপরাধীর বিচার হবে। কারাদজিচের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে সেগুলোর মধ্যে দুইটি অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। একটি হলো বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভো অবরোধ এবং আরেকটি হলো মুসলিম ছিটমহল সেব্রেনিচায় গণহত্যা।
সেব্রেনিচা ছিল জাতিসংঘ ঘোষিত ৬টি ছিটমহলের অন্যতম। অন্য ছিটমহলগুলো ছিল রাজধানী সারায়েভো, বিহাচ, তুজলা, জেপা ও গোরাজদে। ১৯৯৩ সালের ১৬ এপ্রিল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ৮১৯ নম্বর প্রস্তাবে এসব মুসলিম শহরকে নিরাপদ এলাকা বা ‘সেফ হ্যাভেন’ হিসাবে ঘোষণা করে।
এ ঘোষণায় সাড়া দিয়ে ১৮এপ্রিল জাতিসংঘ সৈন্যদের প্রথম দলটি সেব্রেনিচা প্রবেশ করে। অবরুদ্ধ মুসলিম ছিটমহল সেব্রেনিচায় ৭ হাজার ৮শ’ লোককে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। বৃদ্ধ থেকে শুরু করে নবজাতক শিশুও হত্যাকান্ডের শিকার হয়। ১৯৯৫ সালের ১১-১৩ জুলাই সার্ব নেতা রাদোভান কারাদজিচের নির্দেশে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। শহরের লোকজনের একটি অংশকে হত্যা করা হয় জাতিসংঘ সৈন্যদের কম্পাউন্ডে এবং আরো কয়েক হাজার লোককে হত্যা করা হয় পার্শ্ববর্তী আরেকটি মুসলিম ছিটমহল তুজলায় পাড়ি জমানোর পথে। তুজলা ছিল সেব্রেনিচা থেকে ৫৫ কিলোমিটার উত্তরে। পলায়নরত ১৫ হাজার লোকের সঙ্গে খাবার ছিল মাত্র দুই দিনের। তৃতীয় দিন থেকে খাদ্যাভাব দেখা দেয়। ফলে ঘাস, লতা-পাতা তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়। সময়টা ছিল গ্রীষ্মকাল। মাথাফাটা রোদে লোকজন পিপাসার্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু কারো সঙ্গে পানি ছিল না। আশ-পাশ থেকেও পানি সংগ্রহের উপায় ছিল না। এ অবস্থায় সার্বদের গুলিতে তাদের প্রাণ দিতে হয়।
১৯৯৫ সালের ৯ জুলাই স্বঘোষিত সার্ব প্রেসিডেন্ট হিসাবে কারাদজিচ ‘আর্মি অব রিপাবলিকা স্পার্সকা’র (ভিআরএস) দ্রিনা কোরকে সেব্রেনিচা দখলের নির্র্দেশ দিয়ে একটি ডিক্রিতে স্বাক্ষর করেন। তার এ নির্দেশ ‘৭ নম্বর’ নির্দেশ হিসাবে পরিচিত। তিনি জেপা থেকে সেব্রেনিচাকে পৃথক করার এবং দুইটি মুসলিম ছিটমহলের বাসিন্দাদের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার জন্য ভিআরএসকে নির্দেশ দেন। শহরটির নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল ডাচরা। ডাচরা ছিল জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর অংশ। জাতিসংঘ বাহিনীকে বলা হতো ‘আনপ্রোফর’। ডাচ সৈন্য সংখ্যা ছিল ৪শ’। এই ৪শ’ সৈন্যের পক্ষে ১০ বর্গমাইলের সেব্রেনিচা শহর রক্ষা করা সম্ভব ছিল না। এছাড়া ডাচ কমান্ডার লে. কর্নেল টমাস কারামান্সের কোনো তাগিদও ছিল না। সেব্রেনিচা শহরের পটোকারিতে ছিল জাতিসংঘ সৈন্যদের কম্পাউন্ড। এ কম্পাউন্ডে শহরের নিরস্ত্র নারী-পুুরুষ ও শিশুরা আশ্রয় নেয়। আশ্রিতদের রক্ষায় কর্নেল কারামান্স সার্ব জেনারেল রাটকো ম্লাদিচের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। বৈঠককালে তিনি তার সঙ্গে মদ খেয়ে মাতাল হন। এ ছবিও প্রকাশিত হয়। ১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে সার্ব অধিনায়ক জেনারেল ম্লাদিচের নেতৃত্বে নিয়মিত সৈন্য ও আধা-সামরিক স্করপিয়নের সদস্যরা সেব্রেনিচা অবরোধ করে। শিগগির সার্ব সৈন্যরা শহরের উপকণ্ঠে অবস্থান গ্রহণ করে। কিন্তু নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ডাচ সৈন্যরা কিছুই করতে পারেনি। তাদের অস্ত্রশস্ত্র ছিল সামান্য। এছাড়া তাদের সহায়তা লাভের কোনো সুযোগও ছিল না। ৯ জুলাই রাতে সার্ব বিদ্রোহীরা দু’ডজন ডাচ সৈন্যকে জিম্মি করে। জিম্মিদের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশংকায় কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এসময় ডাচ কমান্ডার বিমান হামলা চালানোর জন্য ফরাসীদের প্রতি উপর্যুপরি অনুরোধ জানান। কিন্তু তার অনুরোধে সাড়া দেয়া হয়নি। ১০ জুলাই সেব্রেনিচার পরিস্থিতি ছিল থমথমে। শহরবাসীরা রাস্তায় নেমে আসে। ডাচরা অগ্রসরমান সার্ব সৈন্যদের প্রতি ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে। তবে সরাসরি নয়।
ডাচ কমান্ডার সার্বদের হুঁশিয়ারি দেন যে, শহরের উপকণ্ঠ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করা না হলে ১১ জুলাই ভোর ৬টায় তাদের উপর বিমান হামলা চালানো হবে। তবে তার হুঁশিয়ারি অনুযায়ী সেদিন ভোরে কোনো বিমান হামলা চালানো হয়নি। পক্ষান্তরে, সার্বদের গোলাবর্ষণ আরো তীব্রতর হয়। নিরাপত্তার জন্য হাজার হাজার মুসলমান ডাচ কম্পাউন্ডে ছুটে যায়। পালানোর সময় সার্বদের গোলায় কয়েকজন নিহত হয়। সারাদিন শরণার্থীদের স্রোত বইছিল। সন্ধ্যা নাগাদ ৬ হাজার মুসলমান ডাচ সৈন্যদের কম্পাউন্ডে আশ্রয় নেয়। কম্পাউন্ডে প্রবেশ করার জন্য আরো ২০ হাজার লোক বাইরে অপেক্ষা করছিল। কোনো খাদ্য ও পানি ছিল না। সার্র্ব কমান্ডার জেনারেল ম্লাদিচ প্রতিশ্রুতি দেন যে, নিজ নিজ পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য সার্ব ভূখণ্ডের ভেতর দিয়ে তুজলায় যাবার অনুমতি দেয়া হবে। তবে প্রথমে যেতে হবে পুরুষদের। এসময় সার্ব সৈন্যরা ডাচ সৈন্যদের সদর দপ্তর ঘেরাও করে ফেলে। ম্লাদিচ কম্পাউন্ডে এসে হাজির হন এবং বীর বেশে ছবির জন্য পোজ দেন। একদল মহিলাকে তিনি নিরাপত্তার আশ্বাস দেন। তার পিছু পিছু সেখানে এসে পৌঁছে বিপুল সংখ্যক ট্রাক ও বাস। সার্ব সৈন্যরা তৎক্ষণাৎ জাতিসংঘ কম্পাউন্ডের বাইরে পুুরুষদের থেকে মহিলাদের পৃথক করতে থাকে। তারা ডাচ সৈন্যদের ব্লু হেলমেট কেড়ে নেয় এবং পলায়নরত মুসলমানদের ধোঁকা দেয়ার জন্য এসব হেলমেট পরিধান করে। সাড়ে ৭ হাজার পুরুষ ও বালিকাকে হত্যা করা হয়। তাদেরকে ট্রাকে করে অথবা হাঁটিয়ে তাদের বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হয়। ৩ হাজার লোক পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে। এসব লোককে মাঠে গুলি করে নয়তো বেয়নেট চার্জ করে হত্যা করা হয়। দেড় হাজার লোক একটি গুদামঘরে আটকা পড়ে। মেশিনগানের গুলি চালিয়ে এবং গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তাদের হত্যা করা হয়। কৃষি খামার, খেলার মাঠ কিংবা স্কুলের মাঠে গুলি করে হত্যা করা হয় আরো হাজার হাজার লোক। সামরিক কায়দায় এ হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করা হয়। প্রতিটি ট্রাক চালককেও একজন করে লোককে হত্যা করতে বাধ্য করা হয়। হাজার হাজার লোককে গণকবর দেয়া হয়।
আপনার মন্তব্য দিন
You must be logged in to post a comment.