29th Jul 2008
মিনারেল ওয়াটারের নামে আমরা কি পান করছি
পানির অপর নাম জীবন। আর সে জীবন নিয়েই চলছে প্রতারণা। দেশে উৎপাদিত বোতলজাত মিনারেল ওয়াটার কতখানি বিশুদ্ধ? তৃষ্ণার্ত এ জিজ্ঞাসার উত্তর বাজারের বেশিরভাগ মিনারেল ওয়াটার মানসম্মত নয়। বেশিরভাগ মিনারেল ওয়াটারে পাওয়া যাচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত জীবাণু। এসব পানিতে লেড, ক্যাডমিয়াম ও জিঙ্ক উপাদানের বিন্দুমাত্র অস্তিত্ব নেই। বোতল, জার ও প্লাস্টিক প্যাকেটের পানিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত আয়রন, পিএইচ, ক্লোরিন, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম আছে নামকাওয়াস্তে। অভিযোগ রয়েছে, যথাযথভাবে ফিলট্রেশনও (ছাঁকন প্রক্রিয়া) অনুসরণ করা হচ্ছে না। অনেক কোম্পানি ওয়াসার পানি গামছায় ছেঁকে বোতলে ভরে রমরমা বাণিজ্য করে যাচ্ছে।
কনজুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) পরিচালিত এক রাসায়নিক পরীক্ষায় কয়েকটি ব্র্যান্ডের পানি সম্পর্কে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের পরীক্ষাগারে এসব বোতলজাত পানি পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অতি নিম্নমানের হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বিএসটিআই কর্মকর্তারাও দেশের সর্বত্র নিম্নমানের পানি বাজারজাত হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, বেশিরভাগ কোম্পানি বিএসটিআই’র অনুমোদন নেয়নি। অনুমোদনবিহীন এসব কোম্পানি নিম্নমানের পানি বাজারজাত করছে দীর্ঘদিন থেকে। এসব কোম্পানির মনোলোভা বিজ্ঞাপন এবং লেবেল দেখে আকৃষ্ট হচ্ছেন ক্রেতারা।
মাঝে-মধ্যে বিএসটিআইসহ বিভিন্ন আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে এসব নকল কোম্পানির পানি আটক করছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জরিমানাও করা হচ্ছে। তার পরও এ অপতৎপরতা ঠেকানো যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মিনারেল ওয়াটার বাজারজাত করার জন্য এ পর্যন্ত বিএসটিআই থেকে মাত্র ৩৭টি কোম্পানি অনুমোদন নিয়েছে। অথচ দেশে দুশ’রও বেশি কেম্পানি মিনারেল ওয়াটার বাজারজাত করছে। অনেক কোম্পানি বিএসটিআই’র সিল মেরে পানি বাজারজাত করলেও এসব কোম্পানি ছাড়পত্রের জন্য আবেদন পর্যন্ত করেনি। ঢাকার কারখানাগুলো ‘ঢাকা ওয়াসা’ কর্তৃক সরবরাহকৃত পানি এবং ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করছে। কিন্তু পানি বিক্রি ও সংরক্ষণের জন্য ফুডগ্রেড প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহার বাধ্যতামূলক। নিয়ম অনুযায়ী পানি বাজারজাত করার জন্য স্বচ্ছ বোতল ব্যবহারের নির্দেশ থাকলেও কয়েকটি কোম্পানি অস্বচ্ছ বোতল ব্যবহার করে আসছে। বাজারে প্রচলিত কোম্পানিগুলোর উৎপাদিত পানির বোতলে উৎপাদন ও মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখও থাকে না।
কনজুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মিনারেল ওয়াটারের নামে বোতল ও প্যাকেটজাত পানি পান করে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। প্রধান প্রধান বেশক’টি কোম্পানির পানি পরীক্ষা করে তারা কোনটায় মাত্রাতিরিক্ত লেডের উপস্থিতি পেয়েছেন, আবার কোনটায় পেয়েছেন ক্ষতিকর ক্যাডমিয়ামের অতিরিক্ত উপস্থিতি। পানি বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এসএম ইমামুল হক যুগান্তরকে বলেন, মিনারেল ওয়াটার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী উপদানগুলো দিচ্ছে কিনা তা যাচাইয়ের জন্য নিয়মিত মনিটরিং দরকার। কিছুদিন পরপর বাজার থেকে মিনারেল ওয়াটার নিয়ে এসে পরীক্ষা করা দরকার। যদিও কোম্পানিগুলো দাবি করছে তারা নিয়মিত পরীক্ষা করছে, তবে তাদের বক্তব্য যাচাইয়ের দায়িত্ব বিএসটিআই’র। এক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী উপাদান কম দিয়ে ক্রেতাদের ঠকানো হচ্ছে। নিয়মের অতিরিক্ত থাকলে এতে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। কোন কিছু অতিরিক্ত মানব দেহের জন্য ভালো নয়।
দেশের যেখানে সেখানে যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মতো বোতলজাত পানির নানা প্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠেছে। হাতেগোনা কিছু প্রতিষ্ঠান বিএসটিআই থেকে অনুমোদন নিলেও নমুনার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তারা পানি বাজারজাত করছে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খাবারের হোটেল, ফাস্টফুডের দোকান থেকে শুরু করে চাইনিজ রেস্তোরাঁ, সরকারি-আধাসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা অফিস-আদালতে কনটেইনারে মিনারেল ওয়াটার ব্যবসা জেঁকে বসেছে। প্রতি গ্লাস এক টাকা হওয়ায় যে কেউ তা পান করছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মিনারেল ওয়াটারের নামে তারা কি খাচ্ছেন তা কেউ জানেন না।
প্রায় এক মাস আগে মহাখালী এলাকায় একটি টিনশেড কক্ষে অভিযান চালিয়ে মোবাইল কোর্ট এ ধরনের কারখানার সন্ধান পায়। আইসল্যান্ড ও আটলান্টিক ব্র্যান্ডের দুটি কোম্পানি মিনারেল ওয়াটারের নামে ওয়াসার পানি ভরে তা বাজারজাত করে আসছিল। এ দুটি কোম্পানির নামে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানি সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এর আগে গত বছর একই কারখানায় অভিযান চালিয়ে মোবাইল কোর্ট ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করে। জরিমানার টাকা পরিশোধ করায় আদালত তাদের বিরুদ্ধে আর কোন ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এদিকে জরিমানা দিয়েও কোম্পানি দুটি একই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে।
চলতি বছরের ১৪ মে, ৭ জুন ও ২১ জুন র্যাব-১ এর নেতৃত্বে বাড্ডা ও মেরুল বাড্ডায় ভেজালবিরোধী অভিযান চালানো হয়। অভিযানকারী দলটি নকল পানি প্রস্তুত করার দায়ে বিভিন্ন পাওয়ার ড্রিংকিং ওয়াটার কোম্পানির কাছ থেকে মোট ৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে। এর মধ্যে মেরুল বাড্ডার আফতাবনগর ভূঁইয়া বাড়ির রাজা মিয়ার আরএস ড্রিংকিং ওয়াটারকে জরিমানা করা হয় ৫০ হাজার টাকা। রিফাত পিওর ড্রিংকিং ওয়াটারের মালিক আলমগীর হোসেনকে ১ লাখ টাকা, ওমান পাওয়ার ড্রিংকিং ওয়াটারের মালিক ফারুক হোসেনকে ৩০ হাজার টাকা, সুপার ড্রিংকিং ওয়াটারের মালিক আমির হোসেনকে আড়াই হাজার টাকা, সাভেরা ড্রিংকিং ওয়াটারের মালিক মফিকুল ইসলামকে ৫০ হাজার টাকা, উত্তরার রেইনবো মিনারেল ওয়াটার কোম্পানিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া ৫ জুলাই র্যাব শেওড়াপাড়ায় ৩টি এবং কাজীপাড়ায় পিওর ড্রিংকিং প্লান্টে অভিযান চালিয়ে ৭২ হাজার টাকা জরিমানা করে। র্যাবের মেজর সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, বেশিরভাগ নকল মিনারেল ওয়াটার বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান নগরীর লালবাগ, বাড্ডা, সদরঘাট, ইসলামবাগ, গেণ্ডারিয়া, মিরপুর ছাড়াও শহরতলির জিঞ্জিরা এলাকায় রয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পরই তারা এসব প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালাচ্ছেন বলে জানান।
কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার এমদাদ হোসেন মালেক বলেন, নিরাপদ ভেবে সাধারণ মানুষ টাকা দিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির বোতলজাত পানি কিনে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন। তারা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পানি কিনে পান করে পেটের পীড়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এ ব্যাপারে বিএসটিআই’র মনিটরিং জরুরি। বিএসটিআই’র মহাপারিচালক মোঃ আজমল হোসেন নানা সীমাবদ্ধতার কারণে বাজারে নিয়মিত মনিটরিং করতে পারছেন না বলে যুগান্তরকে জানান। তিনি বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় লোকবল কম থাকায় নিয়মিত মনিটরিং করা সম্ভব হচ্ছে না।
আপনার মন্তব্য দিন
You must be logged in to post a comment.