30th Jul 2008

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় : ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের হাতে শিক্ষক প্রহৃত ৪৪ আবাসিক শিক্ষকের পদত্যাগ

ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে গত সোমবার রাতে ছাত্রলীগের নেতা-কর্র্মীদের হাতে এক শিক্ষক প্রহূত হয়েছেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল মঙ্গলবার পাঁচজন শিক্ষক ওই হলের আবাসিক শিক্ষকের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন।
এ ছাড়া আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দোষীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১টি আবাসিক হলের সব প্রাধ্যক্ষ ও আবাসিক শিক্ষক একযোগে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শিক্ষক সমিতি এক জরুরি সভায় ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রভোস্ট কাউন্সিলের এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছে।
এ ঘটনায় গতকাল রাতে বিভিন্ন হলের আরও ৩৯ জন শিক্ষক আবাসিক শিক্ষকের পদ থেকে পদত্যাগের চিঠি সংশ্লিষ্ট হল প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছেন। তবে এসব পদত্যাগপত্র গতকাল রাত পর্যন্ত গৃহীত হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

 


বঙ্গবন্ধু হলের প্রাধ্যক্ষ, আবাসিক শিক্ষক ও ছাত্ররা জানান, হলটি প্রতিষ্ঠার এক দশক পূর্তি উপলক্ষে এক মাস ধরে হল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। গত সোমবার এসবের পুরস্কার বিতরণী ও নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। সোমবার বিকেলে নৈশভোজের ৭০ টুকরা মুরগির মাংস, ২০ কেজি চাল ও দুই কার্টন আইসক্রিম ছাত্রলীগের দিদার নামে এক কর্মী সরিয়ে ফেলেন। হল প্রশাসন বিষয়টি জানতে পেরে এগুলো উদ্ধার করে। এতে ছাত্রলীগের ওই কর্মী ক্ষুব্ধ হন। পুরস্কার বিতরণী শেষে নৈশভোজ শুরু হয়। রাত সাড়ে ১২টার দিকে নৈশভোজের তৃতীয় ব্যাচে হল প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবক ছাত্ররা খেতে বসেন। খাওয়ার শেষ দিকে রাত পৌঁনে একটায় ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উপসাংস্কৃতিক সম্পাদক দীপক মজুমদার ডাইনিং কক্ষে ঢুকে কেন তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি−এ অভিযোগে অশ্রাব্য গালিগালাজ শুরু করেন। এ সময় আবাসিক শিক্ষক মো. ওয়াকিলুর রহমান কথা বলতে চাইলে তাকে কোনো সুযোগ না দিয়ে দীপক তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন এবং চেয়ার দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করার চেষ্টা করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছাত্রলীগের আরও নয়জন নেতা-কর্মী ছিলেন। অন্য শিক্ষকেরা তখন তাকে রক্ষায় এগিয়ে আসেন। শিক্ষক ওয়াকিলুর রহমান পিঠে ও ঘাড়ে আঘাত পান। তা ছাড়া তাঁকে রক্ষা করতে এসে মোহাম্মদ আলী হোসেন নামের আরেক শিক্ষক আহত হন।
এ ঘটনার পর গতকাল হলটির সব আবাসিক শিক্ষক একযোগে তাদের পদত্যাগপত্র হল কার্যালয়ে জমা দেন। এরা হলেন ড. মো. খায়রুল হাসান ভুঞা, মো. ওয়াকিলুর রহমান, মোহাম্মদ আমিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলী হোসেন ও মোহাম্মদ কামরুল হাছান।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সুত্র জানায়, গতকাল বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টার সম্মেলন কক্ষে প্রভোস্ট কাউন্সিলের জরুরি সভা হয়। সভা শেষে কাউন্সিলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মাসুম আহমাদ বলেন, ‘আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দোষীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্ককার, সনদপত্র বাতিল ও ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ করতে হবে। অন্যথায় সব হলের প্রাধ্যক্ষ ও আবাসিক শিক্ষক একযোগে প্রাধ্যক্ষ ও আবাসিক শিক্ষকের পদ থেকে ইস্তফা দেবেন।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. নজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তদন্ত সাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল বিকেলে পশুপালন অনুষদের গ্যালারিতে শিক্ষক সমিতি জরুরি সভা করে। সভায় শিক্ষক সমিতি প্রভোস্ট কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে।
শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. নুরুল হক ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. মঞ্জুরুল আলম জানান, শনিবার সকাল ১১টার মধ্যে প্রভোস্ট কাউন্সিলের দাবি না মানলে শিক্ষকেরা ক্লাস, পরীক্ষাসহ সব একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রাখবেন।
বঙ্গবন্ধু হলের প্রাধ্যক্ষ বলেন, ‘আমরা এ ঘটনায় জড়িত ১০ ছাত্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে রেজিস্ট্রার বরাবর চিঠি দিয়েছি। অভিযুক্ত ছাত্ররা হলেন দীপক, বিমান, বাবু, ভাস্কর, ফারুক, কামরুল, দীদার, শুভ, সুজন ও সোহান।’
শিক্ষক ওয়াকিলুর রহমান বলেন, ‘আমার গায়ে হাত তোলা মানে পুরো শিক্ষক সমাজের গায়ে হাত তোলা। দুর্বৃত্তদের অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।’
ছাত্রলীগ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সারোয়ার মোর্শেদ আকন্দ জাস্টিজ বলেন, ‘ছাত্রলীগ ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। ব্যক্তিগত কোন্দলের কারণে ওই ঘটনা ঘটতে পারে। আমরাও ওই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। তার পরও দোষীরা যদি ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. শামছুদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ঘটনায় জড়িতদের অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে।’
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতার হোসেন বলেন, ‘এই ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত, নিন্দনীয় ও দুঃখজনক। দোষীরা যেই হোক, শিক্ষকদের ইজ্জত সমুন্নত রাখতে তাদের কঠোর সাজার সম্মুখীন হতে হবে।’

আপনার মন্তব্য দিন

You must be logged in to post a comment.