30th Jul 2008

তুরস্কের বিচার ব্যবস্খা ও সাংবিধানিক আদালত

তুরস্কের বিচার ব্যবস্খা বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত নিয়ে গঠিত। এখানে বেসামরিক আদালতের পাশাপাশি সামরিক আদালত রয়েছে, যা কেবল সেনাসদস্যদের বিচার করে থাকে। বেসামরিক বা সিভিলিয়ন বিচার ব্যবস্খা নিম্ন আদালত বা জুডিসিয়াল কোর্ট, ক্রিমিনাল কোর্ট, স্টেট সিকিউরিটি কোর্ট ও সুপ্রিমকোর্টের সমন্বয়ে গঠিত। এ ছাড়াও রয়েছে কোর্ট অব জুরিসডিকশনাল ডিসপুটস, যা বিভিন্ন আদালত, প্রশাসনিক অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সামরিক আদালতসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের এখতিয়ার বা কর্তৃত্বের সীমানা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে তার মীমাংসা করে থাকে। হাইকোর্ট অব আপিলস, কাউন্সিল অব স্টেট সুপ্রিম মিলিটারী কোর্ট অব আপিলস ও মিলিটারি অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কোর্ট অব আপিলসের বিচারকদের নিয়ে কোর্ট অব জুরিসডিকশনাল আপিলস গঠিত হয়। তবে তুরস্কের বিচার ব্যবস্খায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে বিষয়টি সংযোজন করা হয়েছে, তা হলো কনস্টিটিউশনাল কোর্ট বা সাংবিধানিক আদালত প্রতিষ্ঠা। সংবিধানের মৌলিক নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক কোনো আইন প্রণয়ন করা হলে তা বাতিল করাসহ ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী এই আদালত। মূলত পার্লামেন্টের ও সরকারের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োগের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্খা হিসেবে এই আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়।

সাংবিধানিক আদালত
১৯৫০ সাল থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্ডেরেসের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সরকার ক্ষমতার চরম অপব্যবহার শুরু করার পর বিষয়টি দেশে আলোচনার ঝড় তোলে। বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টি, বৃদ্ধিজীবী মহল ও সামরিক বাহিনী তখন সরকার ও পার্লামেন্টের ক্ষমতা প্রয়োগ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। সামরিক বাহিনী ১৯৬০ সালের ২৭ মে অভ্যুথানের মাধ্যমে মেন্ডেরেসের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ১৯৬১ সালে সামরিক সরকার ও তাদের বেসামরিক সহযোগীরা সংবিধানে সংশোধনী আনার মাধ্যমে পার্লামেন্ট ও সরকারের অবাধ স্বাধীনতায় নিয়ন্ত্রণ আরোপের লক্ষ্যে সাংবিধানিক আদালত প্রতিষ্ঠার বিধান যুক্ত করে। এর পর ১৯৬২ সালের ২৫ এপ্রিল সাংবিধানিক আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯২৪ সালের সংবিধানের মূল কথা ছিল পার্লামেন্টের শ্রেষ্ঠত্ব। কিন্তু নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্খা গ্রহণ করা হয়। এই ব্যবস্খা অনুযায়ী পার্লামেন্টে পাস করা কোনো আইন যদি সংবিধানের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী বলে কেউ এই আদালতে অভিযোগ তোলে তা হলে আদালত তা পর্যালোচনা করে রায় দিতে পারবে এবং সেটাই হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। এ ব্যাপারে পার্লামেন্ট বা সরকারের আর কোনো কিছু করার থাকবে না। শুধু তাই নয়, এই আদালত আইন বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন থেকে তার কার্যক্রম পরিচালনা করবে। সাংবিধানিক আদালত পার্লামেন্টে পাসকৃত যেকোনো আইন ও সংবিধানের সংশোধনী পর্যালোচনা করে তা বাতিল এবং সরকারের জারি করা যেকোনো অধ্যাদেশও বাতিল করে দিতে পারে। এই আদালত দেশের সুপ্রিমকোর্ট বা সর্বোচ্চ আদালত হিসেবে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্য, সাংবিধানিক আদালতের প্রেসিডেন্ট ও সদস্য, হাইকোর্ট বা কোর্ট অব ক্যাসেশনের বিচারপতি, সামরিক আপিল আদালতের বিচারক, প্রধান ও উপসরকারি কৌঁসুলি, কোর্ট অব অ্যাকাউন্টসের বিচারকদের বিরুদ্ধে উথাপিত যেকোনো অভিযোগের বিচার করতে পারে। সাংবিধানিক আদালতে কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘন ও দেশের নিরাপত্তা ও স্বার্থবিরোধী অভিযোগ আনা হলে সেটারও বিচার করে এই আদালত। রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থ ব্যয় অর্থাৎ তহবিল ও অন্যান্য বিষয়েও এই আদালত অডিট করে থাকে। এ ছাড়া পার্লামেন্ট যদি কোনো এমপিকে দায়মুক্তি দেয় বা তার সদস্যপদ বাতিল করে তবে এর বিরুদ্ধে এই আদালতে আপিল করতে পারবেন ওই এমপি। অন্য দিকে ওই এমপিকে দায়মুক্তি দেয়ার বিরুদ্ধে যেকোনো লোক আপিল করতে পারবেন।
তবে ওই বহিষ্কারাদেশ বা দায়মুক্তি সংবিধানের ধারা ও পার্লামেন্টের স্ট্যান্ডিং অর্ডার পরিপন্থী হলেই কেবল আপিল করা যাবে।
আদালতের কাঠামো
সাংবিধানিক আদালত তুরস্কের সংবিধানের ১৪৬ ধারা অনুযায়ী ১১ জন নিয়মিত ও চারজন বিকল্প সদস্যের সমন্বয়ে গঠন করা হয় বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে। দেশটির প্রেসিডেন্ট হাইকোর্ট বা কোর্ট অব ক্যাসেশনের বিচারকদের মধ্য থেকে দু’জন নিয়মিত ও দু’জন বিকল্প সদস্য, কাউন্সিল অব স্টেটের সদস্যদের মধ্য থেকে দু’জন নিয়মিত ও একজন বিকল্প সদস্য, মিলিটারি কোর্ট অব ক্যাসেশন, হাইমিলিটারি অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কোর্ট অব আপিলস এবং কোর্ট অব অ্যাকাউন্টস বা অডিট থেকে একজন করে সদস্য, হায়ার এডুকেশন কাউন্সিল থেকে একজন সদস্য ও প্রশাসনের সিনিয়র কর্মকর্তা ও আইজীবীদের মধ্য থেকে তিনজন নিয়মিত ও একজন বিকল্প সদস্য নিয়োগ দেয়া হয়।
সাংবিধানিক আদালতের নিয়মিত ১১ সদস্যের মধ্য থেকে গোপন ভোটের মাধ্যমে তারা একজনকে আদালতের প্রেসিডেন্ট ও একজনকে ডেপুটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেন চার বছরের জন্য। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তারা আবারো এ পদে নির্বাচিত হতে পারেন একইভাবে। এই আদালতের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তারা রাষ্ট্রের অন্য কোনো পদে থাকতে পারবেন না। আদালতের সদস্যদের উচ্চ শিক্ষিত, নিজ নিজ পেশায় ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা এবং সর্বনিম্ন ৪০ বছর বয়স হতে হবে এবং ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে যেতে পারবেন। সাংবিধানিক আদালতের একজন প্রধান কৌঁসুলি বা চিফ প্রসিকিউটর ও কয়েকজন প্রসিকিউটর থাকেন। এ ছাড়াও থাকেন কয়েকজন উপদেষ্টা বা র‌্যাপোর্টিয়ার। তারা বিচারাধীন মামলার বিষয়ে আদালতকে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তবে তাদের এই পরামর্শ বা সুপারিশ গ্রহণ বা বর্জন আদালতের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ ওই সুপারিশ বা পরামর্শ গ্রহণে আদালত বাধ্য নন।
সংবিধানের আদালতের বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাশিম কিলিক অডিট কোর্ট থেকে ১৯৯০ সালে একজন সদস্য হিসেবে এই আদালতে যোগ দেন এবং ২০০৭ সালের ২২ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট বা সভাপতি নির্বাচিত হন। ডেপুটি প্রেসিডেন্ট ওসমান আলি ফিয়াজ পাকসুট ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও আইনজীবী ছিলেন এবং ২০০৫ সালে তাকে সাংবিধানিক আদালতের সদস্য করা হয়। গত বছর ২৩ অক্টোবর তিনি ডেপুটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। বর্তমান সাংবিধানিক আদালত সংবিধানের ১৯৮২ সালের সংশোধিত ধারা অনুযায়ী কাজ করছে। এই আদালতের আলোচিত কিছু রায়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ১৯৮৯ সালে তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মুসলিম মেয়েদের স্কার্ফ পরার অনুমতি দিয়ে পার্লামেন্টে পাসকৃত আইন বাতিল, ১৯৯৪ সালে দেশের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা বিনষ্টের চক্রান্ত করার অভিযোগে কুর্দিপন্থী ডেমোক্র্যাসি পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষণা, ১৯৯৮ সালে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগে ওয়েলফেয়ার পার্টি বা রেফাহ পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষণা, ২০০১ সালে ভার্চু পার্টি বা ফজিলত পার্টিকেও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা। এবার ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (একেপি) ব্যাপারে এই আদালত কী সিদ্ধান্ত নেয় সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি।
একে পার্টির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আদালতের সামনে বেশ কয়েকটি বিকল্প রয়েছে। আদালত এগুলোর যে কোন একটি বেছে নিতে পারে। আদালতের উপদেষ্টা ওসমান কান তার সুপারিশে বলেছেন যে, একে পার্টির কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ড ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিবিরোধী নয় দেশে ইসলামী শাসন কায়েমের কোনো উদ্দেশ্যও একে পার্টির নেই। আদালত যদি উপদেষ্টার এই বক্তব্য গ্রহণ করে একে পার্টি নিষিদ্ধ না করে তাহলে তুরস্কে চলমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কেটে যাবে।
কিন্তু দলটি নিষিদ্ধ করা হলে চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দেবে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আয়োজন করতে হতে পারে পরবর্তী ৪৫ দিনের মধ্যে। এ ছাড়া প্রেসিডেন্ট দলের কোনো নেতাকে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিতে পারেন কাজ চালানোর জন্য। কারণ আদালত দলের কিছু নেতাকে নিষিদ্ধ করলেও পার্লামেন্টে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তারা পাবে না। অবশ্য নতুন প্রধানমন্ত্রীকে পার্লামেন্টে আস্খাভোটে পাস করতে হবে। অন্য দিকে এ কে পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পর প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টিও নতুন সরকার গঠনের দাবি জানাতে পারে।

আপনার মন্তব্য দিন

You must be logged in to post a comment.