30th Jul 2008

স্খানীয় নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ততায় জনমনে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে

তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে দেশের সংবিধান মেনে চলতে হবে। না হয় আরো বেশি বিপদে পড়তে হবে। এ সরকারের সাংবিধানিক মূল কাজ হচ্ছে­ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করার পাশাপাশি রুটিন কাজ করা। কিন্তু এই মূল দায়িত্বকে পাশ কাটিয়ে সরকার স্খানীয় নির্বাচন নিয়ে বেশি ব্যস্ত। এর ফলে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে জনমনে সন্দেহ-সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে।
রাজধানীতে এক গোলটেবিল আলোচনায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, আইনজ্ঞ, সংবিধান বিশেষজ্ঞসহ বক্তারা গতকাল এ কথা বলেন।


তারা বলেন, স্খানীয় সরকার নির্বাচন অবশ্যই হতে হবে। তবে এই মুহূর্তে নয়। এখন জাতীয় নির্বাচনই জাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি যারা নির্বাচনকে সামনে রেখে সৎ ও যোগ্য প্রার্থী খুঁজছেন তাদের সততা ও যোগ্যতা নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছেন।
ফিন্স থিংকারস ফোরাম বাংলাদেশ জাতীয় প্রেস ক্লাব ভিআইপি লাউঞ্জে ‘সৎ যোগ্য নেতৃত্ব বিকাশে স্খানীয় সরকার নির্বাচন’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. মনিরুজ্জামান মিঞার সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ। আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মাহবুব উল্লাহ, ‘নয়া দিগন্ত’ সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দিন, সাংবাদিক আমানুল্লাহ কবির, নিউ নেশন সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার, কলামিস্ট সাদেক খান, স্খানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আবদুন নূর, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. আবদুল লতিফ মাসুম, এশিয়ান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মীর কামাল চৌধুরী, দৈনিক সংগ্রামের ব্যবস্খাপনা সম্পাদক মাহবুবুল হক, দৈনিক দিনকালের ব্যবস্খাপনা সম্পাদক মারুফ কামাল খান, শাহ আবদুল হালিম, যুবনেতা আবু নাসের মোহাম্মদ রহমাতুল্লাহ ও পান্না চৌধুরী। সঞ্চালক ছিলেন ফিন্স থিংকারস ফোরামের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর চৌধুরী।
বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাজ হলো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করা। কিন্তু অসুবিধাটা দেখা দিল যখন তারা এ কাজটি বাদ দিয়ে স্খানীয় নির্বাচন করার ঢোল পেটানো শুরু করল। তখনই বোঝা গেল, এ নির্বাচন করা নিয়ে তাদের মতলব আছে। তিনি বলেন, সৎ যোগ্য প্রার্থীর জন্য দেড় বছর সংগ্রাম করলেন। অথচ নিজেরা জনগণের কাছ থেকে সততা ও যোগ্যতার সার্টিফিকেট নিতে পারলেন না। আগে ঘুষের লেনদেন টেবিলের ওপরে হতো এখন নিচে হয়। আগে দিনে হতো এখন রাতে হয়। তিনি বলেন, জনগণকে বিশ্বাস করুন। জনগণকে বোকা ভাববেন না। দেখবেন নির্বাচন করতে করতেই সৎ যোগ্য লোক চলে আসবে।
প্রফেসর মনিরুজ্জামান মিঞা বলেন, দেশে যে সংবিধান আছে তা মেনে না চললে আমাদের আরো বেশি বিপদে পড়তে হবে। স্খানীয় সরকার অবশ্যই চাই। কিন্তু এই মুহূর্তে স্খানীয় নির্বাচন চাই না। সরকারের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সঙ্কট আরো বাড়াতে চাই না। এই সরকার তার যে দায়িত্ব সংসদ নির্বাচন তা পালন করলেই সমস্যার সমাধান হবে। তাদের সাংবিধানিক দায়িত্বই হলো সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহযোগিতা ও সরকারের রুটিন কাজ করা। সরকারের একজন বলেছেন, স্খানীয় সরকার নির্বাচনও নাকি রুটিন কাজ। কিন্তু কেউ এটাকে রুটির কাজ মনে করছে না। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ইতোমধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তারা দল ভাঙার কাজ করেছে।
সাদেক খান বলেন, সততা ও যোগ্যতা শুধু নেতার কাছে নয়, সবার কাছেই দাবি করি। আসলে আমাদের মধ্যে এক ধরনের অভিভাবক চেপে বসেছে। তাদের যোগ্যতায় যোগ্য হতে হবে। এলাকায়, দলে নেতৃত্ব দিতে পারাটাই হচ্ছে যোগ্যতা। জনগণকে, দলকে খুশি রাখতে পারাটাই যোগ্যতা। সৎ যোগ্য নেতৃত্বের বিকাশের জন্য স্খানীয় সরকার নয়। জনগণের যে সর্বময় ক্ষমতা সেটার যেন বিকাশ হয় তার জন্যই স্খানীয় নির্বাচন।
ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতক দলই স্খানীয় সরকার চাই না বলার মতো দু:সাহস দেখাবে না। অনেকেই এর আগে স্খানীয় নির্বাচন করার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেছে। তারপরও কেন স্খানীয় সরকার নিয়ে এত সন্দেহ, অবিশ্বাস। কারণ হচ্ছে, খবর ছাপা হলো যে, সংবিধান সংশোধন করা হবে, ইলেকটোরাল কলেজ হবে সংসদ সদস্য ও উপজেলা সদস্যদের নিয়ে। তারাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন। মূলত এ ধরনের খবর থেকেই সন্দেহ এসেছে।
আলমগীর মহিউদ্দিন বলেন, আমরা আজকে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীর কথা বলছি। এটা আন্দোলন করে হবে না। বারবার নির্বাচন হতে দিন। দেখবেন সৎ ও যোগ্য প্রার্থী বেড়িয়ে এসেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। এই দায়িত্ব পালন না করে তারা ধানাই-পানাই করছে। বর্তমান সরকার সবচেয়ে অব্যবস্খানার সরকার বলে আমি মনে করছি। আপনারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করুন, তাহলে দেখবেন সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে।
আমানুল্লাহ কবির, বিদেশীদের দেয়া ফান্ডে যারা সৎ ও যোগ্য প্রার্থী খোঁজার আন্দোলনে নেমেছিলেন, তারা কিন্তু পুরস্কার পেয়ে গেছেন। কেউ জেনেভায় জাতিসঙ্ঘ দফতরে গেছেন, কেউ বড় বড় কাগজ বের করে ব্যবসা করছে। আপনারা যে অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখল করে আছেন, এটা কি সততার পরিচয়? আপনারা সংবিধান বহির্র্ভূত অধিকার প্রয়োগ করছেন। নিজেরাই অসততার আশ্রয় নিয়েছেন। আপনারা যোগ্য হলে দেশের অবস্খা আজকে এরকম কেন?
প্রফেসর ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, নেতৃত্বের আগে সৎ-যোগ্য বিশেষণের প্রয়োজন হয় না। এর কারণ হচ্ছে দেশ অযোগ্য লোকে ভরে গেছে। জাতীয় নির্বাচন হলেই সব সমস্যার সমাধান হবে আমি তা মনে করি না। স্খানীয় সরকার নিয়ে আপনারা কী করবেন, তা আগে বলুন। আগে হোক পরে হোক স্খানীয় নির্বাচন হতে হবে। সংবিধান কেবল জাতীয় নির্বাচনের বেলায় মানলে হবে না। সংবিধান ইচ্ছেমতো ব্যবহার করলে হবে না। দেশের মানুষের কথা চিন্তা করতে হবে।
মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, স্খানীয় সরকার বলতে কী বোঝায় আমাদের ভেবে দেখতে হবে। তিন তিনটি সরকার গেল। তারা ইউনিয়ন পরিষদ ও সিটি নির্বাচনের বিরোধিতা করল না। অথচ উপজেলা ও জেলা নির্বাচন করল না কেন?
 

আপনার মন্তব্য দিন

You must be logged in to post a comment.