31st Jul 2008
সৌদি-কুয়েত থেকে পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশী ফেরত
গত মঙ্গলবার ও গতকাল বুধবার সৌদী আরব ও কুয়েত থেকে পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশী শ্রমিক এক কাপড়ে দেশে ফিরেছেন। রাতারাতি সংসারের অভাব অনটন দূর করার আশায় আদম বেপারিদের খপ্পরে পড়ে বিদেশে গিয়ে হাজার হাজার মানুষ জেলহাজাত বাসে কিংবা নারীদের দেহ ব্যবসায়ে বাধ্য করা হয়েছে। অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন। চাকরির আশায় বিদেশে গিয়ে লাশ হয়ে স্বজনের নিকট ফিরেছেন। প্রায়ই এই ধরনের ঘটনার সংবাদ পাওয়া যায়। প্রত্যাগত শ্রমিকদের অভিযোগ: কুয়েত ও সৌদী আরব থেকে বাংলাদেশী শ্রমিকদের জোর করে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। মঙ্গল ও বুধবার দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন ফ্লাইটে এই সকল কপর্দকহীন শ্রমিক দেশে ফিরেছেন।
জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে আগতদের স্ত্রী, সন্তান ও পিতামাতাকে জড়িয়ে ধরে কুয়েত ও সৌদী আরবে নির্মম নির্যাতনের করুণ কাহিনী বর্ণনা করে তারা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। প্রত্যাবর্তনকারীদের অনেকে অর্ধাহারে অনাহারে থাকায় দেহ কংকালসার। তারা সহায় সম্বল বিক্রি করে বিদেশে চাকরি করার আশায় গিয়ে শূন্য হাতে দেশে ফিরেছেন। এখন পরিবারের সদস্যদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য ভিক্ষা করা ব্যতীত কোন উপায় নেই বলে তারা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তারা কুয়েত ও সৌদী আরবে পুলিশের নির্মম অত্যাচারের শিকার হয়েছেন। প্রত্যাগত শ্রমিকরা অভিযোগ করেন যে, সেখানকার বাংলাদেশী দূতাবাস তাদের জন্য কিছুই করেনি। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক আবদুল মালেক বলেছেন, অবৈধভাবে কিংবা জাল ভিসায় অথবা জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে বিদেশে লোক পাঠানোর কারণে এই পর্যন্ত ৪টি জনশক্তি রপ্তানিকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল, ১২টির কার্যক্রম স্থগিত এবং শতাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। এই সকল অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নিচ্ছেন বলে মহাপরিচালক জানান। সরকারের কঠোর অবস্থানের পরও একশ্রেণীর আদম বেপারি জাল ভিসা দিয়ে শত শত নিরীহ অশিক্ষিত শ্রমিককে বিদেশে পাঠিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। নারীদের বাসা বাড়িতে কিংবা অফিসে লোভনীয় কাজ দেয়ার কথা বলে বিদেশে প্রেরণ করে তাদের দেহ ব্যবসায় বাধ্য করা হচ্ছে। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক নারী চাকরির আশায় বিদেশে যাচ্ছেন। জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে রাতে গেলে এই সকল নারীর চিত্র দেখা যায়।
কুয়েতে এখনো অনেক শ্রমিক ধর্মঘটে
এদিকে বিবিসি জানায়, বেতন-ভাতা ও কাজের পরিবেশ উন্নত করার দাবিতে বাংলাদেশী শ্রমিকদের আন্দোলন মিটে গেছে- কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে একথা জানানো হলেও শ্রমিকদের ধর্মঘট এখনো অব্যাহত রয়েছে বলে স্থানীয় এক সাংবাদিক জানান। কুয়েতে বাংলাদেশী সাংবাদিক মুরাদ হোসেন লোকমান আরো জানান, কুয়েতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় কুয়েত থেকে ধর্মঘটী বেশ কিছুসংখ্যক বাংলাদেশী শ্রমিককে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, কিছুসংখ্যক শ্রমিক কাজে যোগদান করেছেন। বেশিরভাগ শ্রমিক ধর্মঘটে আছেন এবং অনেকে তাদের ব্যারাকে ফিরে যাননি। পুলিশের ভয়ে তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
তিনি বলেন, গত সোমবার শ্রমিকদের সঙ্গে কুয়েতের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষের ফলে মঙ্গলবার রাতে আড়াইশ’ থেকে তিনশ’ পরিচ্ছন্ন কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। আরো কিছু পাঠানোর জন্য উদ্যোগ নিয়েছে এদেশের সরকার। তিনি বলেন, কুয়েতে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় যে খবর আসছে তাতে দেখা যায়, এখনো প্রায় ১ হাজার শ্রমিককে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন কোম্পানির প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার শ্রমিক এখনো ধর্মঘট চালিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের ধর্মঘট ও কর্মবিরতির ফলে কুয়েতে বিভিন্ন রকম অসুবিধার সৃষ্টি হয়েছে। কুয়েতের বিভিন্ন রাস্তা-ঘাটে বিশেষ করে আবাসিক এলাকা ও বাণিজ্যিক এলাকায় রাস্তার পাশে ময়লার স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। কারণ কিছুদিন ধরে ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার হয়নি। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসের চার্জ দ্য এফেয়ার্স মহিউল ইসলাম বিবিসিকে বলেন, কুয়েতে যেসব ধর্মঘটী শ্রমিক ছিলেন তাদের বেশিরভাগই কাজে যোগ দিয়েছেন। তবে ধর্মঘটীদের আংশিক এখন ধর্মঘটে আছেন। তিনি বলেন, আনুমানিক ৭ থেকে ৮ হাজার শ্রমিক ধর্মঘটে এখনও আছেন। তিনি বলেন, গোলমালের সঙ্গে জড়িত যাদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা গেছে শুধু তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাবে যারা নিরীহ তাদের ফেরত পাঠানোর কোন সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি। তিনি বলেন, গ্রেফতারকৃত বাংলাদেশীর মধ্যে ৩শ’ জনকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ৮শ’ থেকে ১ হাজারের মতো গ্রেফতার করা হয়েছিল। যাদের আটক রাখা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তিনি বলেন, আমরা এই তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করব।
আপনার মন্তব্য দিন
You must be logged in to post a comment.