03rd Aug 2008
কলম্বোয় সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের বর্ণাঢ্য উদ্বোধন
দক্ষিণ এশিয়াকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত, নিরাপদ ও উন্নত অঞ্চল হিসাবে গড়ে তুলতে একযোগে কাজ করার ডাক দিয়েছেন সার্কের আট দেশের শীর্ষ নেতারা। শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা- সার্কের পঞ্চদশ শীর্ষ সম্মেলনের দুইদিনের আসরের উদ্বোধনী পর্বে আট শীর্ষ নেতা এ আহ্বান জানান। গতকাল শনিবার সকালে কলম্বোয় বন্দর নায়েক স্মৃতি আন্তর্জাতিক সম্মেলন হলে সার্ক সম্মেলনের আকর্ষণীয় ও বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে তাঁরা বলেন, সমগ্র এশিয়ায়ই আজ সন্ত্রাসবাদের ভয়াবহ শিকার। সন্ত্রাস সম্ভাবনাময় এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়া ব্যাহত করছে। সার্ক দেশগুলো একযোগে কঠোর হস্তে সন্ত্রাস মোকাবিলা করে এ অঞ্চলকে শান্তি, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
বিশ্বব্যাপী খাদ্যদ্রব্যের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে সার্ক নেতারা বলেন, এর নেতিবাচক প্রভাবে এ অঞ্চলের মানুষ আজ মারাত্মক খাদ্যাভাবের শিকার। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রত্যাশিত খাদ্য উৎপাদন বিঘিœত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলা তথা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। তাই কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রযুক্তি নির্ভর কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন, কৃষিতে বহুমুখি ফলন উদ্ভাবনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
অনুষ্ঠানে সার্ক নেতারা প্রায় অভিন্ন সুরে দারিদ্র্য বিমোচন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা অর্জন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধা অপসারণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
শীর্ষ নেতারা বলেন, দেড়শ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিক দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। তাদের জীবনমান উন্নয়নে অভিন্ন কর্মপন্থা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার এখনই সময়। যাতে অল্প সময়ের মধ্যেই এ অঞ্চলটি এশিয়ার একটি অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে বিকাশ লাভ করতে পারে। এজন্য বিদ্যমান চালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সমন্বিত কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা জরুরি বলে তারা মনে করেন।
প্রায় তিন ঘণ্টা স্থায়ী পঞ্চদশ সার্ক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি ছিল আকর্ষণীয় ও ঝাঁকজমকপূর্ণ। সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন স্বাগতিক শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাহেন্দ রাজাপাকসে। সম্মেলনে যোগ দেয়া অপর সাত দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানগণ কড়া নিরাপত্তা প্রহরায় তাঁদের হোটেল স্যুট থেকে সম্মেলন হলে এসে পৌঁছলে কয়েকশ শিশু-কিশোর শ্রীলঙ্কার ঐতিহ্যবাহী নাচ গান দিয়ে তাদের বরণ করে নেয়। রাষ্ট্রীয় অতিথিদের স্বাগত জানান শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট। পরে শীর্ষ নেতারা নিজ নিজ দেশের জাতীয় পতাকাশোভিত তৈল প্রদীপ জ্বালিয়ে ও স্মারক ডাক টিকেট উন্মোচনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন। এরপরই তাঁরা একসঙ্গে সম্মেলন হলে প্রবেশ করেন এবং অনুষ্ঠান মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও সার্কের বিদায়ী চেয়ারপারসন ড. মনমোহন সিং সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেন। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাহেন্দ রাজাপাকসে উদ্বোধনী ভাষণ দেন। এরপর তিনি সার্কের রীতি অনুযায়ী সার্ক চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন। পরে পর্যায়ক্রমে ভাষণ দেন আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লিওনচে জিগমি থিনলে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মামুন আব্দুল গাইয়ুম, নেপালের প্রধানমন্ত্রী গিরিজা প্রসাদ কৈরালা এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি।
এ ছাড়া উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সার্কের অন্যতম পর্যবেক্ষক ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মানুসেহের মোতাক্কি সাতটি দেশ ও সংস্থার পক্ষে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে সার্কের পর্যবেক্ষক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মরিশাস এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরাও যোগ দেন। যুক্তরাষ্ট্রের উপ-সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিচার্ড বাউচার এবং অন্যান্য দেশের মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধিরা সম্মেলনে সার্কের প্রতি আগ্রহ ও সহযোগিতার আশ্বাস সম্বলিত নিজ নিজ দেশের বাণী পৌঁছে দেন।
অনুষ্ঠানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ দক্ষিণ এশিয়াকে আরো শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও অগ্রসর অঞ্চল হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে সার্কের এই সম্মেলনকে একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ উল্লেখ করে বলেন, আমাদের পিছিয়ে পড়া চলবে না। স্বপ্ন ও দর্শন নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের কল্যাণ ও বৃহত্তর অগ্রগতি সাধন করতে সার্কের জন্য একটি ‘রোডম্যাপ’ প্রণয়ন করা আমাদের দায়িত্ব। এজন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অঙ্গীকার প্রয়োজন। বাংলাদেশ এজন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়াকে একটি স্থিতিশীল, সক্রিয় ও সমৃদ্ধ অঞ্চলে রূপ দিতে ভারত তার ভূমিকা পালন করতে প্রস্তুত। কারণ আমি আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। সার্কের অগ্রযাত্রায় ঘোষণা থেকে বাস্তবায়নের পথে পা বাড়িয়েছি। এর সুফলও আসতে শুরু করেছে। তাই আমাদের কার্যক্রম অগ্রাধিকারভিত্তিক ও যৌক্তিক হওয়া দরকার। যাতে সার্কের সুফল আমাদের জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারি।’ সন্ত্রাসবাদ দমনে সকলের সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের কোন সীমানা নেই।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি বলেন, এখন সময় এসেছে জনগণকে সার্কের মূল কেন্দ্রে স্থান দেয়ার। জনগণই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি বলেন, এ অঞ্চলের মধ্যে পাকিস্তান সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাসী আক্রমণের শিকার। এর থেকে পুরো অঞ্চলকে মুক্ত রাখতে ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব সবার।
আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই বলেন, আফগানিস্তান আজ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের থাবায় জ্বলছে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করা। হীনমন্য রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ বহাল রাখলে সন্ত্রাসবাদ আরও বেড়ে যাবে।
শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাহেন্দ রাজাপাকসে বলেন, সার্ককে জনকেন্দ্রিক, সমন্বিত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও অংশীদারিত্বমূলক করতে হবে। টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সংযোগ গড়ে তুললে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ দৃঢ় হবে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী গিরিজা প্রসাদ কৈরালা বলেন, সার্কের আওতায় যুগপৎ কার্যক্রম হাতে নিলে সামগ্রিক অগ্রগতি সাধন সম্ভব হবে। কারণ ২৩ বছরে সার্ক এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে আস্থা ও বন্ধন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুল গাইয়ুম বলেন, সার্কের স্বপ্ন বাস্তবায়নে বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচী গ্রহণ করলে আমরা পৃথিবীর অন্য যে কোন অঞ্চলের চেয়ে শক্তিশালী জাতিগোষ্ঠী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবো।
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লিওনচে জিগমি থিনলে বলেন, দারিদ্র্র্যমোচনের বিষয়টি সার্ক কর্মকৌশলে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
আপনার মন্তব্য দিন
You must be logged in to post a comment.