03rd Aug 2008
তুরস্কে ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতার রসায়ন
রেচেপ তাইয়িপ এর্দোয়ান - ইসলামী কট্টরপন্থী না প্রগতিশীল সমাজ সংস্কারক?
তুরস্কের ক্ষমতাসীন AK পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে৷ এই ঘটনার ফলে তুরস্কের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে রাষ্ট্র ও ধর্মের রসায়নের বিষয়টি আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে পড়েছে৷
প্রেক্ষাপট
কোনো গণতান্ত্রিক দেশের ক্ষমতাসীন দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার প্রচেষ্টার কথা শুনলে বিস্ময় জাগাই স্বাভাবিক৷ কিন্তু তুরস্কের ইতিহাস ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বৈশিষ্ট্যের আলোকে বিষয়টি অত্যন্ত জটিল৷
সংবিধান অনুযায়ী তুরস্ক এক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র৷ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মুস্তাফা কেমাল আতাতুর্ক দেশটিকে আধুনিক এক পরিচয় দিতে চেয়েছিলেন৷ তাই শুরু থেকেই দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় হেজাবের মত ধর্মীয় প্রতীক নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল৷ স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই এই কড়া নিয়ম চালু ছিল৷ ইসলাম ধর্মের সঙ্গে পশ্চিমা সভ্যতার এক মেলবন্ধন ঘটানোর অভিনব পরীক্ষার দৃষ্টান্ত আধুনিক তুর্কী রাষ্ট্র৷ দেশের এই ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর ধারক, বাহক ও রক্ষাকর্তা হিসেবে দায়িত্ব শুরু থেকেই নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিল শক্তিশালী সেনাবাহিনী৷ তাদেরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শহুরে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত এক শ্রেণী, যারা আধুনিক উদার এক সমাজের সুফল ভোগ করে এসেছে৷
ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা
যখনই সেনাবাহিনীর মনে হয়েছে, যে ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনা বিপন্ন - তখনই তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে দ্বিধা করে নি৷ তবে প্রতিবারই তারা সংবিধানের মর্যাদাকেই প্রাধান্য দিয়েছে৷ অভ্যুত্থান ঘটিয়েও ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখে নি৷ ইসলামী ভাবধারায় দীক্ষিত রাজনৈতিক শক্তি গণতান্ত্রিক পথে ক্ষমতায় এলেও সেনাবাহিনী ও ধর্মনিরপেক্ষতার সমর্থকেরা তাদের নানাভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে - কখনো অভ্যুত্থান ঘটিয়ে, কখনো বা তাদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করে৷ প্রতিবারই সেই সেই ইসলামী শক্তি নাম বদলে এবং নতুন একঝাঁক নেতাদের সামনে রেখে আবার শক্তিশালী হয়ে উঠেছে৷
AK দলের আদর্শ
আদালত ভে কাকিনমা পার্তিসি– বা AK পার্টির ক্ষেত্রেও এই প্রবণতার কোনো ব্যতিক্রম ঘটে নি৷ প্রধানমন্ত্রী রেচেপ তাইয়িপ এর্দোয়ান ও প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গ্যুল ইসলামী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ এই দলের সবেচেয়ে পরিচিত মুখ৷ দুজনের স্ত্রীই হেজাব পরেন - তাই তাঁরা কখনো রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেন না৷ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসে AK পার্টি৷ গ্যুলকে প্রেসিডেন্ট করার ক্ষেত্রে বাধা আসায় আগাম নির্বাচন ডেকে আবার বিপুল ভোটে জয়লাভ করে ক্ষমতায় ফেরে এর্দোয়ানের দল৷ ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের লক্ষ্যে এই দলের নেতৃত্বেই সবচেয়ে বড় সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল৷ কিন্তু অন্যদিকে ঐ দল হেজাবের উপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার যে উদ্যোগ শুরু করল, সেই প্রচেষ্টার পেছনে ধর্মনিরপেক্ষ কেমালপন্থী শিবির এক বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের ছায়া দেখতে পেল৷ তাদের অভিযোগ, AK পার্টি এইভাবে ধাপে ধাপে দেশকে কট্টরপন্থী ইসলামী ভাবধারার দিকে চালিত করার চেষ্টা করছে৷ ফলে সাংবিধানিক আদালতে গোটা দলকেই নিষিদ্ধ করার আবেদন জানানো হয়েছিল৷
আদালতের রায় ও ভবিষ্যত্
বুধবার আদালত রায় দিয়েছে৷ AK পার্টিকে নিষিদ্ধ করার আবেদন নাকচ করে দিলেও অভিযোগের ভিত্তি সম্পর্কে আদালতও মোটামুটি একমত৷ দেশের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির বিরোধিতা করার দায়ে ঐ দলকে আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে৷
এর্দোয়ানের নেতৃত্বে AK পার্টি এই নিয়ে পর পর দুবার আইনী খাঁড়ার কোপ থেকে বেঁচে গেল - যদিও ঐ দলের কার্যকলাপ সম্পর্কে ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের সন্দেহ এখনো কাটে নি৷ ফলে অদূর ভবিষ্যতে AK পার্টির বিরুদ্ধে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে - এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না৷
এখন প্রশ্ন হলো, এই আদর্শগত সংঘাতের ফলে AK পার্টি নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে কার্যকলাপ ও পরিকল্পনার ক্ষেত্রে কতটা রদবদল ঘটাবে৷ ইতিমধ্যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে দল এমন সব কর্মসূচি আপাতত মুলতুবি রাখছে, যা বিতর্কের সৃষ্টি করতে পারে৷ একেবারে স্বাভাবিক কোনো রাজনৈতিক দলের মতোই তারা অর্থনৈতিক সংস্কার, কুর্দি সঙ্কটের সমাধান, ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি কাজে মন দেবে৷ কিন্তু দলের মধ্যে রক্ষণশীল অংশ ও যে সব ভোটাররা সমাজে ধর্মীয় প্রভাব বাড়ানোর পক্ষপাতী, তাঁরা এই বিষয়টি কীভাবে দেখবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়৷ আদালতের রায়ের ফলে ক্ষমতাকেন্দ্রে শূন্যতা সৃষ্টি না হওয়ায় আপাতত সবাই হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে৷
আপনার মন্তব্য দিন
You must be logged in to post a comment.