05th Aug 2008

চার সিটিতে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন

মেয়র পদে সিলেটে কামরান, বরিশালে সান্টু রাজশাহীতে লিটন ও খুলনায় খালেক এগিয়ে
নয়া দিগন্ত ডেস্ক

কামরান; সান্টু; লিটন; খালেকঃ খুলনায় পুত্রবধূর কোলে চড়ে ভোট দিতে আসেন ১১০ বছর বয়সী রহিমা বিবি (বাঁয়ে); বরিশালের একটি ভোট কেন্দ্রে মহিলাদের দীর্ঘ লাইনঃ নয়া দিগন্ত
 
বড় কোনো অঘটন ছাড়াই কড়া নিরাপত্তার মধ্যে চার সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। প্রাথমিক আংশিক ফলাফলে সিলেট, খুলনা ও রাজশাহীতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী যথাক্রমে বদরুদ্দিন আহমেদ কামরান, তালুকদার আবদুল খালেক ও খায়রুজ্জামান লিটন এবং বরিশালে পিডিপি সমর্থিত প্রার্থী সরফুদ্দিন আহমদ সান্টু এগিয়ে আছেন।
খুলনার ২৩৯টি কেন্দ্রের মধ্যে সর্বশেষ প্রাপ্ত ১১টি কেন্দ্রের ফলাফলে ৮ হাজার ৫৩২ ভোট পেয়ে তালুকদার আবদুল খালেক এগিয়ে আছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মনিরুজ্জামান মনি পেয়েছেন ৪ হাজার ৭৯০ ভোট।
বরিশালের মোট ৯১টি কেন্দ্রের মধ্যে সর্বশেষ প্রাপ্ত ১৩টি কেন্দ্রের ফলাফলে সরফুদ্দিন আহমাদ সান্টু ৬ হাজার ৮১৬ ভোট পেয়েছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ সমর্থিত শওকত হোসেন হিরণ পেয়েছেন ৬ হাজার ৪১৪ ভোট।
রাজশাহীর ১২৯টির মধ্যে সাতটি কেন্দ্রের বেসরকারি ফলাফলে খায়রুজ্জামান লিটন ৪ হাজার ২৭৩ ও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল ২ হাজার ৫৯৯ ভোট পেয়েছেন।
সিলেটের ১২০টি কেন্দ্রের মধ্যে ৩৯টির প্রাথমিক ফলাফলে বদরুদ্দিন আহমেদ কামরান ৬২ হাজার ৮৫৪ এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আ ফ ম কামাল পেয়েছেন ১৪ হাজার ১২১ ভোট।
ভোট গ্রহণের শুরুতে বিভিন্ন স্থানে ভোটার ক্রমিক নিয়ে কিছুটা বিভ্রাট দেখা দিলেও প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপের ফলে সমস্যাটি কেটে যায়। বিভিন্ন স্থানে ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে ভোটার ক্রমিক নম্বর না থাকায় সমস্যায় পড়েন। জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে ভোটার তালিকায় নামের মিল না থাকায় এ সমস্যা সৃষ্টি হয়। বিকেল ৪টার মধ্যে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কোথাও কোথাও সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ করা হয়েছে।


বিচ্ছিন্ন দু-একটি ঘটনা ছাড়া জালিয়াতি বা পক্ষপাতিত্বের গুরুতর কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। সব ক’টি সিটি করপোরেশনেই বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন প্রথম থেকেই এ নির্বাচনকে টেস্ট কেস হিসেবে উল্লেখ করে আসছে। আইডি কার্ড, নতুন আচরণবিধি ও জরুরি অবস্থার মধ্যে বাংলাদেশে এটাই প্রথম নির্বাচন। চার সিটি থেকে সংবাদদাতাদের পাঠানো খবরঃ
দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া খুলনায় শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন
খুলনা ব্যুরো জানায়, যথেষ্ট উৎসাহ-উদ্দীপনা বিচ্ছিন্ন দু-একটি অপ্রীতিকর ঘটনা, ভোটার তালিকার ত্রুটির কারণে ভোটারদের বিড়ম্বনা ও ভোটকেন্দ্রে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ব্যাপক অভিযোগের ভেতর দিয়ে গতকাল খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে।
এদিকে মেয়র প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনি নগরীর আলীয়া মাদ্রাসা কেন্দ্রে, তালুকদার আব্দুল খালেক পাইওনিয়র গার্লস স্কুল, অ্যাডভোকেট এনায়েত আলী বি কে ইউনিয়ন স্কুলে, সিপিবি’র ফিরোজ আহমেদ আব্দুল গনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈয়াবুর রহমান সুন্দরবন কলেজে ভোট দেন।
গতকাল সকাল ৮টা থেকে ভোট গ্রহণ শুরুর আগেই নগরীর ভোট কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের সমাগম শুরু হতে থাকে। সময় গড়ানোর সাথে সাথে ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভিড় বাড়তে থাকে। নগরীর পিটিআই’র তিনটি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের শুরু থেকে ভোটারদের প্রচণ্ড চাপ লক্ষ করা যায়। এখানে তিনটি কেন্দ্র একই স্থানে হওয়া এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে ভোটারদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে মহিলাদের গেট দিয়ে পুরুষরা ঢুকতে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। বাধা অতিক্রম করে ঢোকার চেষ্টাকালে পুলিশ মৃদু লাঠিচার্জ করে। লিফলেট বিতরণকালে সেখান থেকে হারুন অর রশীদ ও মাসুদ নামে দুই ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এ ছাড়া ভোটার স্লিপ কেড়ে নেয়ার অভিযোগে শেরেবাংলা রোডের আমতলা এলাকা থেকে শামিমুল ইসলাম, মাহবুব ও রওশন জামিল মিঠুকে গ্রেফতার করা হয়। ১৭ নম্বর ওয়ার্ড খুলনা টেক্সটাইল মিল স্কুল কেন্দ্রে কাউন্সিলর প্রার্থী আনিসুর রহমান বিশ্বাসের কর্মীরা তার অন্যান্য প্রার্থীর ভোটারদের কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এ ছাড়া নগরীর অন্যান্য কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ চলে। তবে দুপুর ও বিকেলে দুই দফা বৃষ্টির কারণে ভোটারদের কেন্দ্রে গমনে বিঘ্ন ঘটে। বিকেল সাড়ে ৩ টার দিকে দ্বিতীয়বার ভারী বর্ষণের কারণে বিপুলসংখ্যক ভোটার ভোট দিতে পারেনি। বৃষ্টি থামার পরে অনেকেই ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হলে সময় শেষ বলে তাদের ঢুকতে দেয়া হয়নি।
খুলনা আলীয়া মাদ্রাসা, পিটিআই, সরকারি সিটি কলেজ, তালিমুল মিল্লাত মাদ্রাসা, টেক্সটাইল মিল স্কুল ও সরকারি বিএল কলেজসহ বেশ কিছু কেন্দ্র পরিদর্শনকালে ভোটাররা জানান, ভোটার তালিকায় তাদের ক্রমিকের সাথে তাদের নাম ছবির মিল না হওয়ায় তারা ভোট দিতে পারছেন না। এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশনের পরামর্শ অনুযায়ী মোবাইল ফোনে ম্যাসেজ দিয়েও সমস্যার সুরাহ হয়নি বলে ভোটাররা জানান। মেয়র প্রার্থী মোসলেম উদ্দিন তার নির্দিষ্ট কেন্দ্র পিটিআইতে এসে তালিকায় নাম না পেয়ে ভোট দিতে পারেননি।
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ সর্বত্রই পাওয়া গেছে। মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট এনায়েত আলী আলীয় মাদ্রাসা কেন্দ্র পরিদর্শন কালে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন একজন মেয়র প্রার্থী চেয়ার প্রতীক বুকে লাগানো সমর্থকদের নিয়ে কেন্দ্র পরিদর্শন করছেন। পরে বাধা দেয়া হয়েছে বলে শুনেছি। বিধি লঙ্ঘনের এ সুযোগ প্রথম থেকেই দেয়া উচিত হয়নি। অপর মেয়র প্রার্থী মোসলেম উদ্দিনও আচরণবিধি ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে জানান। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। প্রায় সব কেন্দ্রেই চেয়ার প্রতীকের ব্যাজ বুকে লাগানো লোকদের অবাধে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। কোনো কেন্দ্রে আনারস প্রতীক লাগানো লোকজন সকালে ঢুকলেও পুলিশ তাদের বের করে দেয়। তালিমুল মিল্লাত মাদ্রাসা, খুলনা টেক্সটাইল মিল স্কুল ও পল্লীমঙ্গল হাইস্কুল কেন্দ্রে কয়েক ভোটার কেন্দ্রে গিয়ে তার ভোট আগেই দেয়া হয়েছে বলে জানতে পারেন।
ভোট পর্যবেক্ষণ করতে গতকাল ফেমা, ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ ও জানিপপসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রায় ৫ হাজার পর্যবেক্ষক এবং বিভিন্ন মিডিয়ার শতাধিক সাংবাদিক ভোটকেন্দ্রগুলোতে ঘুরে বেড়ান। নগরীতে সরকারি ছুটি দেয়া হয়েছিল। শহরের বেশিরভাগ দোকানপাট বন্ধ ছিল। এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত ভোট গণনার কার্যক্রম চলছিল।

বরিশালে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন
বরিশাল ব্যুরো থেকে কামাল মাছুদুর রহমান ও আযাদ আলাউদ্দিন জানিয়েছেন, কিছু জটিলতা ও দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া গতকাল বরিশাল সিটি করপোরেশেন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে শান্তিপূর্ণভাবে। সকালের দিকে বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেলেও দুপুরের পর ভোটার উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। কয়েকটি কেন্দ্রে ভোটারদের চাপ বেড়ে যাওয়ায় ভোট কেন্দ্র এলাকার অভ্যন্তরে থাকা ভোটারদের ভোটগ্রহণ করতে রাত ৮-৯টা বেজে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
‘নয়া দিগন্ত’ বরিশাল ব্যুরোর দুই প্রতিবেদক নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের ৯১টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে প্রায় অর্ধশত ভোট কেন্দ্র সরেজমিন ঘুরে দেখেছেন। কম-বেশি প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটারদের ক্রমিক নম্বর সংগ্রহ করতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে ভোট দিতে গিয়েও ভোটার তালিকার ক্রমিক নম্বরের সাথে না মিলে যাওয়ার কারণে অনেকে ভোট দিতে পারেননি বা বিলম্বিত হয়েছে। এ জন্য ভোটগ্রহণ ধীরগতিতে সম্পন্ন হয়েছে।
উপনির্বাচন কমিশনার ও বিসিসি নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার মনিরুল ইসলাম জানান, এবারের নির্বাচনে ৭০-৭৫ ভাগ ভোটার ভোট প্রদান করেছেন।
বেশির ভাগ ভোট কেন্দ্রেই পুরুষ ভোটারদের চেয়ে মহিলা ভোটারদের উপস্থিতি ছিল বেশি। সারা দিনই আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিতরা রাস্তায় টহলে ছিল। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ভোটাররা ভোট প্রদান করেছেন।
বিসিসি’র ভোট গ্রহণ সম্পর্কে মেয়র প্রার্থী হিরণ, কামাল, চাঁন, এনায়েত পীর খান, সান্টু, সৈয়দ আবদুল্লাহ শহিদ জানান, ধীরগতিতে ভোট গ্রহণ হয়েছে। বর্ষাকালের কারণে কিছু সমস্যা হচ্ছে। ভোট গ্রহণের ব্যাপারে সবাই সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
সিলেট ব্যুরো থেকে এনামুল হক জুবের ও মোঃ আফতাব উদ্দিন জানান, সিলেটের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো স্বচ্ছ ভোটের নির্বাচনে নগরীর ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা থাকায় জাল ভোটের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে পুলিশের সাথে অশোভন আচরণের কারণে রেলওয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার ও কাউন্সিলর প্রার্থী সেলিম আহমদ রনিকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে আসা হয়। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিনি আটক রয়েছেন। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেও ভোটাররা সকাল ৮টার আগেই ভোটকেন্দ্রে হাজির হন। বৃষ্টির কারণে প্রথম দিকে ভোটারদের উপস্থিতি কম হলেও দুপুর ১২টার পর থেকে ভিড় বাড়তে থাকে প্রতিটি কেন্দ্রে।
অনেকে ভোট দিতে পারেননি
ভোটাররা কেন্দ্রের ভেতরে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও ভোট গ্রহণের সময় পেরিয়ে যাওয়ায় প্রিজাইডিং অফিসার ভোট গ্রহণ বন্ধ ঘোষণা করেন। এতে অনেক ভোটার ভোট দিতে না পেরে ফেরত যান। বিকেল ৩টা ৫৫ মিনিটে ভোট গ্রহণ বন্ধ করে দেয়া হয় শাহী ঈদগাহ এলাকার একটি কেন্দ্রে। এ কেন্দ্রের তিন-চারজন ভোটার অভিযোগ করে বলেন, আমরা প্রায় ২টা থেকে ভোট দেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু কেন্দ্রে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও ভোট গ্রহণ না করায় প্রতিবাদ করলে পুলিশ তাদের লাঠিপেটা করে।
প্রশাসনের কড়া নজরদারিঃ প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে পুলিশ আনসারের পাশাপাশি র‌্যাবের টহল জোরদার থাকায় কোনো কেন্দ্রে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারেনি। তবে কোনো কোনো প্রার্থী ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করলে তাৎক্ষণিকভাবে তা প্রতিহত করা হয়।
রাজশাহী ব্যুরো থেকে নাজিব ওয়াদুদ ও সরদার এম আনিছুর রহমান জানান, জরুরি অবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোট গ্রহণকালে কোথাও কোনো বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। ভোট কেন্দ্রগুলোর ভেতরে ও বাইরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মোবাইল স্ট্রাইকিং ফোর্সের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। সব মিলেই নজিরবিহীন নিরাপত্তার মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গতকাল ভোর থেকেই রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় ভোট কেন্দ্রগুলোর আশপাশে গড়ে তোলা হয় তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে ২৮ জন এবং ৫২টি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের প্রতিটিতে ৩০ জন করে পুলিশ এবং আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। রাজশাহী মহানগর পুলিশের বিশেষ শাখার সহকারী পুলিশ কমিশনার আকরামুল হোসেন জানান, গতকাল বিভিন্ন কেন্দ্রে ৪ হাজার ২৯৫ জন পুলিশ এবং আনসার সদস্য মোতায়েন ছিল। তাদের মধ্যে পুলিশ সদস্য ২১০৩ জন ও আনসার সদস্য ২১৯২ জন।
অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ভোট কেন্দ্রের চারপাশে কড়া নজরদারির দায়িত্বে ছিল গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক টিম। একই সাথে ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ২৮টি মোবাইল টিম, সাতটি আর্মড ব্যাটালিয়ন মোবাইল টিম সক্রিয় ছিল। এ ছাড়া তিনটি স্ট্রাইকিং রিজার্ভ টিম ছিল। প্রত্যেক দলের নেতৃত্ব ছিলেন একজন করে ম্যাজিস্ট্রেট, একজন এএসপি, ২০ জন করে পুলিশ সদস্য। অন্য দিকে নির্বাচনে র‌্যাবের ১৩টি মোবাইল টিম কাজ করেছে। অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও মাঠে সক্রিয় ছিল।
সকাল ৮টা থেকেই ভোটাররা ভোট কেন্দ্রগুলোতে ভিড় করতে থাকে। সকালে বৃষ্টির কারণে কিছুটা বিঘ্নিত হলেও সাড়ে ১০টার পর থেকে ভোট কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। প্রায় প্রত্যেকটি ভোট কেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন পড়ে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন ভোটাররা। ভোট গ্রহণ করতে বুথগুলোতে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের বেশ বেগ পেতে হয়। এ সময় ভিড় সামলাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও বেশ হিমশিম খেতে হয়। তবে কোথাও বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। ভোটাররা জানিয়েছেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার তারা অধিক শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এবং ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। তবে আইডি কার্ড নিয়ে অনেক ভোটারকেই বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছে। ভোট প্রদান করতে আইডি কার্ডের প্রয়োজন নেই­ নির্বাচন কমিশনের এমন ঘোষণার পরও গতকাল রাজশাহীর বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোটাররা এ নিয়ে হয়রানির শিকার হয়েছেন। অভিযোগ পাওয়া গেছে, অধিকাংশ ভোট কেন্দ্রে ভোটারদের কাছে আইডি কার্ড চাওয়া হয়েছে। আইডি কার্ড দেখাতে না পারায় অনেককে ফেরত দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পোলিং এজেন্ট ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের বক্তব্য হচ্ছে, আইডি কার্ড থাকলে ভোটারদের সহজেই চিহ্নিত করা যাচ্ছে। আইডি কার্ড ছাড়া ভোট দিতে এসে অনেকেই হয়রানির শিকার হয়েছেন। বরেন্দ্র কলেজ কেন্দ্রে এমন বিস্তর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সকালে মেয়র প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন ও মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল উপশহর স্যাটেলাইট হাইস্কুলে, রেজাউন নবী দুদু, আবদুল মতিন খান ও রায়হানুর রহমান রায়হান হোসেনীগঞ্জ সরকারি বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে, মাসুদুল হক ডুলু দক্ষিণ দড়িখরবোনা প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুরুল হুদা রানীবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, অ্যাডভোকেট এনামুল হক রাজশাহী ইসলামি গবেষণা কেন্দ্র মডেল স্কুল, নাসির আহমেদ বিদ্যুৎ শিরইল সরকারি উচ্চবিদ্যালয় এবং আবদুল খালেক রাজশাহী কোর্ট একাডেমি স্কুল কেন্দ্রে ভোট প্রদান করেন। এ ছাড়া অন্যান্য মেয়র প্রার্থী নিজ নিজ এলাকায় ভোট প্রদান করেন।
শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ায় প্রার্থীরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
রাজশাহী বিভাগীয় উপনির্বাচন কমিশনার ও রিটার্নিং অফিসার সৈয়দ মোহাম্মদ মূসা আনন্দ ও সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এবারের নির্বাচন নজিরবিহীন নিরাপত্তার মধ্যে খুবই শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোটাররাও সব ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন তাদের তিনি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
উল্লেখ্য, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫৮ হাজার ৭৫৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৪৭ জন এবং মহিলা ১ লাখ ২৯ হাজার ২১২ জন।
নির্বাচনে মোট ভোট কেন্দ্র ছিল ১২৯টি এবং বুথের সংখ্যা ৭৭৪টি। ১২৯ জন প্রিজাইডিং অফিসার, ১ হাজার ৫৫৮ জন পোলিং অফিসার, ৭৭৪ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার, নিয়োগকৃত ২৮১ জন নির্বাচনী এজেন্ট এবং প্রার্থীদের মনোনীত এজেন্ট প্রায় ৪ হাজার ভোট গ্রহণের দায়িত্ব পালন করেছেন।

আপনার মন্তব্য দিন

You must be logged in to post a comment.