05th Aug 2008
মাদ্রিদ সম্মেলনঃ ধর্মে ধর্মে সঙ্ঘাত নয়, সমঝোতা
-আ মা নু ল্লা হ ক বী র
<<<এ ধরনের বৈঠক আমাদের অব্যাহত রাখতে হবেঃ বাদশাহ আবদুল্লাহ ও টনি ব্লেয়ার
খবরটি তেমন প্রচার পায়নি। আন্তর্জাতিকভাবে পায়নি বলে দুয়েকটি পত্রিকা বা টিভি চ্যানেল ছাড়া আমাদের মিডিয়াও খবরটি উপেক্ষা করে গেছে। খবরটি কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা নয়। প্রধান ও একমাত্র কারণ আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রায় সবই নিয়ন্ত্রিত ইসলামবিরোধী শক্তিগুলো দিয়ে। যে কারণে এরা ইসলামবিরোধী খবর প্রচার করেই অভ্যস্ত। গত মাসে স্পেনের মুসলিম ঐতিহ্যসমৃদ্ধ মাদ্রিদে ‘ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স অন ডায়ালগ’ নামে যে সর্বধর্মীয় সম্মেলনটি হয়ে গেল তার আয়োজনে মূল উদ্যোক্তা ছিলেন সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহ। এ গন্ধের কারণেই আন্তর্জাতিক মিডিয়া এমন একটি ঘটনার খবর প্রচারে আগ্রহী হয়নি। সৌদি বাদশাহর উদ্যোগে ইতঃপূর্বে এ ধরনের আরেকটি সম্মেলন মক্কায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এ দু’টি সম্মেলনেরই আয়োজন করে ‘মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ’ এবং বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্মের ধর্মীয় জ্ঞানী-গুণী ও চিন্তাবিদদের আমন্ত্রণ জানানো হয়, যাতে তাদের মধ্যে মতবিনিময়ের সুযোগ হয়। মাদ্রিদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে প্রধান মিত্র সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্ল্লেয়ারও যোগ দিয়েছিলেন। আন্তঃধর্মীয় সমঝোতার ব্যাপারে তিনি এখন বেশ উৎসাহী এবং এর ওপর কাজও করছেন। তিনি এখন নিয়মিত চার্চেও যাচ্ছেন। ব্লেয়ারের এটা যে নতুন উপলব্ধি তা বোঝা যায়। বুশের সাথে আফগানিস্তান ও ইরাক আক্রমণ করে তিনি ভালো বা মন্দ কী করেছেন, তার মূল্যায়ন নিশ্চয় এখন করছেন। সম্ভবত সে কারণেই বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সমঝোতার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। যা হোক, স্বাগতিক দেশ স্পেনের রাজা ভুয়ান কার্লসও বাদশাহ আবদুল্লাহর সাথে মাদ্রিদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। মুসলমান, খ্রিষ্টান, ইহুদিসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের স্কলারদের সাথে ভারত থেকে হিন্দু ধর্মের একটা প্রতিনিধি দলও এ সম্মেলনে যোগ দেয়। মোট কথা, প্রধান ধর্মগুলোর স্কলারদের মিলন ঘটেছিল এখানে। গুণগত ও সময়গতভাবে এটা ছিল একটা অনন্য ঘটনা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সে অর্থে বাদশাহ আবদুল্লাহ চলমান বিশ্বপরিস্থিতি উপলব্ধি করে বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টির জন্য এক অনন্য প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। সমগ্র মানবজাতিকে সভ্যতার সঙ্ঘাতের নামে যেভাবে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়েছে, তা থেকে মুক্তির অন্বেষণায় তিনি সভ্যতার মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ নিয়ে পবিত্র মক্কা ও মদিনার রক্ষক হিসেবে সময়োচিত ভূমিকাই গ্রহণ করেছেন। নাইন-ইলেভেনের ঘটনার পরপরই প্রেসিডেন্ট বুশ ওই ঘটনাকে সভ্যতার ওপর বর্বতার হামলা বলে আখ্যায়িত করে ‘ক্রুসেড’ ঘোষণা করেছিলেন। তার এ ক্রুসেড ছিল প্রকৃতপক্ষে মুসলিম সভ্যতার বিরুদ্ধে। বুশের ‘ওয়ার অন টেরর’ তথা সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ তাই পরিচালিত হয় মুসলিমবিশ্বের বিরুদ্ধেই।
সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ ঘোষণা করে দখল করা হয়েছে দু’টি মুসলিম দেশ আফগানিস্তান ও ইরাক। ওই সাথে পাকিস্তানের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হয়ে ওঠে। এক কথায় বলা যায়, খ্রিষ্টান ধর্ম প্রভাবিত পশ্চিমা সভ্যতার প্রতিনিধিত্বকারী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারা দুনিয়ায় যে সঙ্ঘাত ছড়িয়ে দিয়েছে, এর বিপরীতে মুসলিমবিশ্বের প্রতিনিধিত্বকারী সৌদি আরব ‘সভ্যতার সমঝোতার’ উদ্যোগ নিয়েছে। আজ আমরা সভ্যতার সঙ্ঘাত বলে যা দেখছি, তা কোনো নতুন ঘটনা নয়। হাজার হাজার বছর আগে অনার্যদের বিরুদ্ধে আর্যদের যে আক্রমণের ঘটনা ঘটেছিল, তা-ও ছিল সভ্যতার সঙ্ঘাত। তাকে যদি ইতিহাসের বর্বর যুগের অধ্যায় বলা হয়ে থাকে, তবে তারই পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে বুশ প্রশাসন। টুইন টাওয়ার কাদের হামলায় ধ্বংস হয়েছে, তার এখনো সুনিশ্চিত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই ঘটনার নায়ক হিসেবে যে ওসামা বিন লাদেনের কথা বলা হয়েছে, সেই লাদেন ইসলাম বা মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করে না, এটা পশ্চিমা বিশ্বের না জানার কথা নয়। হান্টিংটন যে তত্ত্ব দিয়েছেন তার ভিত্তিতে। লাদেনকে ‘ডামি’ বা প্রতীক হিসেবে দাঁড় করিয়ে গোটা মুসলিম বিশ্বকে টার্গেট করা হয়েছে। হান্টিংটনের বই ’ঞযব ঈষধংয ড়ভ ঈরারষরুধঃরড়হং ধহফঃযব জবসধশরহম ড়ভ ডড়ৎষফ ঙৎফবৎ’-এর মূল তত্ত্ব হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ব্লকের পতনের পর পুঁজিবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমা বিশ্বের নিরাপত্তার প্রতি প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে উঠতি বিশাল মুসলিম জগৎ। কেন তিনি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখিয়েছেন। মুসলিম জগতের প্রাকৃতিক সম্পদ, জনবল, সামরিক শক্তি, শিক্ষাদীক্ষা, অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান অগ্রগতির হিসাব-নিকাশ দিয়ে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, কিভাবে পশ্চিমা বিশ্বের জন্য তা অপ্রতিরোধ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্বের জন্য একটা উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছেন তিনি তথ্য ও তত্ত্বে, যা পাশ্চাত্য সভ্যতা ও জনপদকে নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কায় শঙ্কিত করে তোলে। স্বাভাবিকভাবেই তখন আমেরিকা ও ইউরোপে ইসলামবিরোধী একটা মনোভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মুসলমানদের সবাই সন্দেহের চোখে দেখতে থাকে। ইসলাম ও ইসলাম অনুসারীদের নিয়ে পাশ্চাত্য মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও প্রচার প্রোপাগান্ডা শুরু হয়, যা মুসলমানবিরোধী বিদ্বেষকে ইউরোপ-আমেরিকার জনপদে গরলের মতো ছড়িয়ে দেয়। ইসলাম নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে এত আলোচনা ও গবেষণা এর আগে আর কখনো হয়নি। যদিও এসবের সবই হচ্ছে ইসলামপরিপন্থী। ইসলাম জঙ্গিধর্ম এবং মুসলমানরা সন্ত্রাসী, এটা প্রমাণ করাই এসব আলোচনা ও গবেষণার মূল বিষয়বস্তু ছিল। ইতিহাস বিকৃত করে বলা হয়েছে, ইসলাম অস্ত্রবলে প্রচারিত হয়েছে। তাই এ ধর্ম জঙ্গিধর্ম, শান্তির ধর্ম নয়। এ পরিস্থিতির শিকার ইউরোপ-আমেরিকার মুসলমান নাগরিকরাও হয়ে পড়ে। তারা নিজেদের ধর্ম ও অবস্থানকে রক্ষার জন্য পাল্টা তৎপর হয়ে ওঠে। তার ফলে ছোটখাটো দাঙ্গাও ঘটে যায়। মুসলিম মহিলারা মাথায় স্কার্ফ পরতে পারবে কি না, তা পাশ্চাত্য খোলামেলা সভ্যতার পরিপন্থী কি না, এমন সাধারণ ঘটনাও সঙ্ঘাতের সৃষ্টি করে। পরিস্থিতিকে উসকে দেয়া হয় হজরত মোহাম্মদ সাঃ-কে ব্যঙ্গ করে নানা ধরনের কার্টুন প্রকাশ করে। ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় নেতা পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট এক পর্যায়ে ইসলামকে জঙ্গিধর্ম বলে আখ্যায়িত করে আগুনে ঘি ঢালার কাজ করেন। যদিও পরে তিনি তার এই মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।
এ অবস্থার মধ্যেও বেশ কিছু অদ্ভুত ও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছে পশ্চিমা বিশ্বে। মার্ক শ্লেইকার নিউইয়র্কবাসী একজন ইহুদি বুদ্ধিজীবী। অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে সবসময় তিনি নতুন সাংস্কৃতিক ও অধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াতেন। অর্থনৈতিক পদ্ধতি হিসেবে ল্যাটিন আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাকে আকৃষ্ট করে। ঘুরতে ঘুরতে এক সময় আফ্রিকার মরক্কোয় চলে যান। দেশে ফিরে তিনি পাশ্চাত্য নাগরিকজীবনে পরিচয়বিমুখতা দেখে শিউরে ওঠেন। এরপর একদিন নিউইয়র্কের এক রাস্তায় পথচারীদের সামনে হাতে পবিত্র কুরআন তুলে ধরে বলেন, ’ঞযবৎব রং হড় এড়ফ নঁঃ এড়ফ ধহফ গড়যধসসধফ রং যরং ঢ়ৎড়ঢ়যবঃ’. অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মোহাম্মদ তার প্রেরিত পুরুষ। এভাবে জনসমক্ষে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ঘোষণা দেন। নাম ধারণ করেন আবদুল্লাহ শ্লেইকার। তিনি এখন বিশ্বের খ্যাতনামা মুসলিম স্কলার ও বুদ্ধিজীবীদের একজন। গত বছর বিশ্বের যে ১৩৮ জন ইসলামি চিন্তাবিদ খ্রিষ্টান ধর্মীয় নেতাদের কাছে ধর্মীয় সংলাপের প্রস্তাব দেন তিনি তাদের অন্যতম স্বাক্ষরকারী। এই ইসলামি চিন্তাবিদদের আরো কয়েকজনের ধর্মান্তরিত হওয়ার ঘটনা এমনই বিচিত্র ও বিস্ময়াবহ। আরো নতুন খবর হচ্ছে এমন সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতিতেও ইউরোপ ও আমেরিকায় অনেক নতুন মসজিদ নির্মিত হয়েছে বা হচ্ছে। এসব ঘটনা ও প্রতিক্রিয়া আমেরিকা ও ইউরোপের রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। খোদ বুশ প্রশাসনেই এ নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। অনেক অমুসলিম ধর্মীয় স্কলার নিরপেক্ষভাবে ইসলামের পুনর্মূল্যায়নে মনোনিবেশ করেছেন এবং কিছু কিছু গবেষণামূলক বইও ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ এ কথা বলা যায়, পাশ্চাত্য সভ্যতার ক্রিয়ার (অ্যাকশন) পর এখন প্রতিক্রিয়া (রিঅ্যাকশন) শুরু হয়েছে, যা সঙ্ঘাতের বদলে সঙ্ঘাত নয়, সমঝোতা। এই প্রতিক্রিয়াই সম্ভবত টনি ব্লেয়ারকে নতুন চিন্তা-চেতনায় অনুপ্রাণিত করেছে। এখন তার মুক্তভাবে চিন্তাভাবনা করার সুযোগও হয়েছে। ব্লেয়ার নিজেও জানতেন সাদ্দাম হোসেনের সাথে লাদেনের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তার পরও ইরাক তাদের আক্রমণের শিকার হয়েছিল। ইরাক দখল ও সাদ্দামকে ফাঁসিতে ঝুলানো তাদের জন্য কতটুকু যুক্তিযুক্ত হয়েছে, এখন মুক্ত মন নিয়ে তিনি হয়তো তা নতুন করে মূল্যায়নের চেষ্টা করবেন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন সমঝোতার মন নিয়ে কিছু দিন আগে প্যালেস্টাইন সফর করেন। তিনি সেখানে হামাস সরকারের নেতাদের সাথে বৈঠক করেন। কিন্তু তার এ সফরকে প্রেসিডেন্ট বুশ ভালো চোখে দেখেননি। তিনি এর পরপরই ইসরাইলে পাল্টা সফরে যান এবং ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য সার্বিক সমর্থন পুনঃনিশ্চিত করেন। এ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বারাক ওবামাও ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশ সফর করছেন। তিনি মার্কিন দখলে থাকা যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকও সফর করেন এবং ইরাকের জনগণ ও তার দেশের দখলদার সৈন্যদের আবারো আশ্বাস দেন যে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ১৬ মাসের মধ্যে ইরাক থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করবেন। প্রেসিডেন্ট বুশ যে ইরানকে ‘এক্সিস অব ইভিল’- এর অন্যতম সদস্য দেশ বলে অভিহিত করেছিলেন ওবামা তার সাথে সরাসরি কথা বলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। দ্বন্দ্ববিক্ষুব্ধ বিশ্বে সঙ্ঘাতের পরিবর্তে সমঝোতার বার্তা পৌঁছিয়ে দেয়াই তার এসব সফর ও প্রতিশ্রুতির মূল উদ্দেশ্য। বুশের পররাষ্ট্রনীতি বিশ্বের দরবারে মার্কিন ভাবমর্যাকে যেভাবে আগ্রাসী ও একচেটিয়াবাদী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, তা পুনরুদ্ধারের তাগিদ থেকেই ওবামা এই সমঝোতার নীতি গ্রহণ করেছেন। বুশ প্রশাসনের সময় গুয়ান্তানামো ও আবু গারিবের নৃশংস ঘটনাবলি এবং একক পরাশক্তি হিসেবে জেনেভো কনভেনশনের লঙ্ঘন মার্কিন ইতিহাসে যে কলঙ্কময় অধ্যায় সৃষ্টি করেছে তা মার্কিন ভোটারদের চোখ খুলে দিয়েছে এবং তা তাদের এখন উন্মাদের মতো তাড়িত করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল যে বুশের মানবতাবিরোধী এসব ঘটনার আলোকেই নির্ধারিত হবে, এটা এখন স্পষ্ট।
সভ্যতার সঙ্ঘাতের সাথে খ্রিষ্টান ও ইসলাম ধর্ম ছাড়াও জড়িত হয়ে পড়েছে ইহুদি ও হিন্দু ধর্ম। পরবর্তী দু’টি ধর্মের সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়ার মূল কারণ সাম্প্রদায়িক ও ভূ-রাজনৈতিক। জন্মগত কারণেই আরব ভূখণ্ডে মার্কিন স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে ইসরাইল। এ জন্য ইসরাইল পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হলেও দোষের কিছু নেই। বস্তুতপক্ষে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল একমাত্র পারমাণবিক শক্তি। ইরান এখন পর্যন্ত পারমাণবিক শক্তি অর্জন না করেই প্রেসিডেন্ট বুশের চোখে শয়তান তথা ‘ইভিল’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ইসরাইলের নিরাপত্তার কারণেই মার্কিন প্রশাসনকে ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করতে হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, পবিত্র জেরুসালেম দখল করে ইহুদিদের বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল খ্রিষ্টানরা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধেও ইহুদিরা হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছিল খ্রিষ্টানদের হাতেই। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেও ইসরাইলের প্রথম প্রেসিডেন্ট ওয়েজম্যানকে ইহুদি বলে তার স্ত্রী কখনো বাসার ভেতর ঢুকতে দেননি বা আপ্যায়ন করেননি। ট্রুম্যান তখনো প্রেসিডেন্ট হননি। কৌতূহলবশত একদিন ওয়েজম্যান তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি তো কোনো দিন তোমার বাসার ভেতরে আমাকে আপ্যায়ন করলে না।’ ট্রুম্যান হেসে জবাব দিয়েছিলেন, ‘ওখানে আমার কর্তêৃত্ব নেই, কর্তৃত্ব আমার স্ত্রীর।’ উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের আমলেই ইসরাইলের প্রতিষ্ঠা হয়। মার্কিন সমর্থনপুষ্ট ইসরাইল এখন প্যালেস্টাইন ভূখণ্ডের দুই-তৃতীয়াংশই দখল করে বসে আছে। এর একমাত্র কারণ আরব মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে চরম অনৈক্য ও বৈরী ভাব। শিয়া-সুন্নির যে দ্বন্দ্ব রয়েছে, তা-ও অনেকাংশে দায়ী। ইরাক যুদ্ধে শিয়াদের সমর্থন হামলাকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ ছিল।
আবার মাদ্রিদ সম্মেলনের বিষয়ে ফিরে আসা যাক। একবার এক চীনা সরকারি কর্মকর্তা বাদশাহ আবদুল্লাহকে বলেছিলেন, ‘তোমরা সৌভাগ্যবান তোমাদের তেল আছে, তোমরা মহান জাতি।’ জবাবে বাদশাহ জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘না, ইসলাম ধর্মের কারণে আমরা মহান জাতি।’ বলা যায়, তারই প্রাথমিক প্রতিফলন ঘটেছে মাদ্রিদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে। প্রেসিডেন্ট বুশ ‘সভ্যতার সঙ্ঘাতের’ নামে নতুন করে যে ঠাণ্ডা লড়াই শুরু করেছেন, তা সহসা শেষ হওয়ার নয়। ধর্ম ছিল, আছে এবং থাকবে। সুতরাং এ ঠাণ্ডা লড়াইও যে আদর্শেরই হোক অব্যাহত থাকবে, যে পর্যন্ত না পৃথিবীতে ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন ঘটে। সে পরিবর্তনের সুযোগ মুসলিম বিশ্বকেও গ্রহণ করতে হবে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে।
নেতৃত্বের সঙ্কটই মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা, যা পাশ্চাত্য সভ্যতার ক্ষেত্রে নেই। পবিত্র মক্কা ও মদিনা শরিফের কাস্টডিয়ান বা রক্ষক হিসেবে এ দায় অবশ্যই সৌদি বাদশাহর ওপর বর্তায়। তিনি হয়তো সে দায়বোধ থেকেই মাদ্রিদ সম্মেলনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ধর্মে-ধর্মে সমঝোতা সৃষ্টির অব্যাহত প্রক্রিয়া হিসেবে এ ধরনের সম্মেলন আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোতে যেমন অনুষ্ঠিত হতে হবে, তেমনি অনুষ্ঠিত হতে হবে মুসলিম দেশগুলোতেও। মানবতাবিরোধী সভ্যতার সঙ্ঘাতকে ঠেকাতে হলে এমন উদ্যোগ খ্রিষ্টান ধর্মপ্রভাবিত পশ্চিমা বিশ্বের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদেরও নিতে হবে। সঙ্ঘাতের পরিবর্তে ধর্মে-ধর্মে সমঝোতাই হোক মিলেনিয়ামের চ্যালেঞ্জ।
লেখকঃ বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট
আপনার মন্তব্য দিন
You must be logged in to post a comment.