06th Aug 2008
কী ঘটেছিল বরিশালে? ২৬ ঘণ্টা পর হিরনকে বিজয়ী ঘোষণা
ভোররাত সাড়ে চারটার ঘটনা। বরিশালের রিটার্নিং কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম ডেকে পাঠালেন পলিটেকনিক কলেজ কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আব্দুল কাদের ব্যাপারীকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম থেকে উঠে ছুটে এলেন তিনি। তাঁকে ফলাফল লেখা কাগজটি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করা হলো, এটি তাঁর দেওয়া এবং নিজের হাতে লেখা কি না। তিনি ?হ্যাঁ? বললে তাঁকেই সেটি পড়ে শোনাতে বলা হয়।
কাদের ব্যাপারী পড়ে শোনালেন, এখানে এস শরফুদ্দিন আহম্মেদ সান্টু পেয়েছেন ৫৬৭ ভোট আর শওকত হোসেন হিরন পেয়েছেন ৩৭০ ভোট। সেখানে উপস্থিত হিরন সেটা মেনে নিয়ে সামগ্রিক ফলাফল ঘোষণার দাবি জানালেন। কিন্তু উপস্থিত সান্টু তাতে বাগড়া দিয়ে অভিযোগ করলেন, এ ফলাফল নতুন করে বানানো হয়েছে।
এ সময় দুই মেয়র পদপ্রার্থী, নির্বাচন কর্মকর্তা ও র্যাব-পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্িথতিতেই ওই প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মাইকে বললেন, ?আমি ফলাফল এখানে (অফিসে) দিয়ে গেছি রাত ১০টায়। শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়ায় দ্রুত চলে গেছি। তবে তার আগে ওই ফলাফলের একটি কপি রেজিস্টার্ড ডাকযোগেও নির্বাচন কমিশনার বরাবর পাঠানো আছে। এরপর কেন দেরি হয়েছে তা আমি জানি না।?
এ কথা শুনে সান্টু আবার অভিযোগ করেন, ?ওই ফলাফলের কাগজে স্বাক্ষর ও হাতের লেখা প্রিসাইডিং কর্মকর্তার নিজের কি না তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।? এর জবাবে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা বলেন, ?কাগজ ঠিক আছে, স্বাক্ষর এবং হাতের লেখা আমারই; অন্য কারও নয়।? তখন সান্টু দাবি করেন, তাঁকে ৯১টি কেন্দ্রের সব ফলাফলের কাগজ পরীক্ষা করতে দেওয়া হোক।
নির্বাচন কমিশন তাতে রাজিও হয়। কিন্তু একপর্যায়ে সান্টু নিজেই তা দেখবেন না জানিয়ে কমিশন কার্যালয় ত্যাগ করেন।
এ ঘটনাটি গত সোমবার বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর ভোট গণনার সময় ঘটে যাওয়া রাতভর নাটকের শেষ পর্যায়ের একটি দৃশ্য। এর আগে-পরের দৃশ্যগুলোও জমজমাট সব ঘটনায়। সান্টু চলে যাওয়ার পর একপর্যায়ে ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে রিটার্নিং কর্মকর্তা ৯১টি কেন্দ্রের সব কটির প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ঘোষণা করেন। কিন্তু কে বিজয়ী বা পরাজিত, তা আর তিনি বলেন না। শুধু বলেন, আপাতত বেসরকারিভাবে ভোটসংখ্যা প্রকাশ করা হলো। আগামীকাল বিকেল চারটায় সব প্রার্থীর উপস্িথতিতে জয়-পরাজয়ের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। তিনি জানান, মোট প্রাপ্ত ভোট অনুযায়ী শওকত হোসেন হিরন পেয়েছেন ৪৬ হাজার ৭৯৬, সরদার শরফুদ্দিন আহম্মেদ সান্টু পেয়েছেন ৪৬ হাজার ২০৮। হিরন তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ৫৮৮ ভোট বেশি পেয়েছেন। তিনি ফলাফলের একটি স্বাক্ষরিত কপি হিরনের হাতে দেন।
হিরন সেটা নিয়ে বের হওয়ার সময় উপস্িথত সাংবাদিকেরা তাঁকে ঘিরে ধরে জানতে চান, সব কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণার আগেই তা প্রত্যাখ্যান করে এখন আবার কেন ফলাফল মেনে নিলেন?
জবাবে হিরন বললেন, ?কী হয়েছে না-হয়েছে, আপনারাও সব দেখেছেন।?
কী হয়েছিল সেই রাতে: বরিশালে এটাই এখন একমাত্র প্রশ্ন। রাত তিনটা পর্যন্ত হিরন এগিয়ে থাকার পর কয়েকটি কেন্দ্রের ফলাফল আর আসে না। আরও পরে একটির ফলাফল আটকে রাখা হয়। এর আগে কয়েকটি কেন্দ্রে লাঠিপেটার ঘটনা ঘটেছে। হিরনের বিজয় যখন নিশ্চিত বলে জানা যায়, তখন এক পর্যায়ে সান্টুর লোকজন আওয়াজ ছড়ায়− জিতেছে সান্টু। সেটা নিয়ে ঘটে উত্তেজনা, দুই প্রার্থীর হাতাহাতির উপক্রম পর্যন্ত। শেষমেশ ভোট গ্রহণের প্রায় ২৬ ঘণ্টা পর গতকাল বিকেল পাঁচটায় বরিশাল নির্বাচন কমিশন বেসরকারিভাবে শওকত হোসেন হিরনকে বিজয়ী ঘোষণা করে। মাঝখানে ঘটে যায় রহস্যগল্পের মতো এক ঘটনা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘটনাস্থলে থেকে প্রত্যক্ষ করা নাটকীয় ঘটনাটি ছিল এ রকম:
রাত নয়টায় শুরু: সোমবার রাত নয়টায় বরিশাল নির্বাচন কমিশন ফলাফল ঘোষণা শুরু করে। কিন্তু শুরু থেকেই কিছুটা ধীরগতি লক্ষ করা যায়। প্রথমে মেয়র পদপ্রার্থীদের ভোটের ফলাফল একটি-দুটি কেন্দ্র করে ঘোষণা করা হলেও একপর্যায়ে একসঙ্গে ১০টি করে কেন্দ্রের ফলাফল একবারে ঘোষণা শুরু করে কমিশন। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুলে যায় ওই প্রক্রিয়া। তবে ঘোষিত ফলাফলে সব সময়ই হিরন কিছু না কিছু ভোটে এগিয়ে ছিলেন।
রাত দেড়টায় বিভিন্ন মেয়র পদপ্রার্থীর এজেন্টদের কাছ থেকে সংবাদকর্মীরা যখন ৬৪টি কেন্দ্রের ফলাফল সংগ্রহ করেন, তখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করে ৫১টি কেন্দ্রের ফলাফল। রাত দুইটায় নির্বাচন কমিশনের ঘোষণায় ৬১টি কেন্দ্রের ফলাফলে হিরন পান ২৯ হাজার ৪১৪ এবং সান্টু ২৮ হাজার ৯৫৭ ভোট।
দীর্ঘ বিরতি শুরু: এর পরই ফলাফল ঘোষণার প্রক্রিয়ায় লম্বা বিরতি শুরু হয়। তখন পর্যন্ত ওই কক্ষে সাতটি কেন্দ্রের ফলাফল এসে পৌঁছায়নি বলে সংবাদকর্মীদের জানান নির্বাচন কর্মকর্তারা। আর যেগুলো এসে পৌঁছেছে, সেগুলো ঘোষণার উপযোগী করতে কিছুটা সময় লাগছে বলেও জানানো হয়। তবে এ সময় বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে আসা কয়েকজন প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে ফলাফল নিয়ে ওই কক্ষে ঢুকে আবার বেরিয়ে দোতলার আরেক কক্ষে যেতে দেখা যায়। এমনকি দোতলার কক্ষে গিয়ে সংবাদকর্মীরা দেখতে পান, কোনো কোনো প্রিসাইডিং কর্মকর্তা সেখানে বসে নিজেদের খাম খুলে পুনরায় ফলাফলের হিসাব-নিকাশ করছেন।
কোনো কোনো প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ফলাফল ঘোষণার জন্য নির্ধারিত মিলনায়তনে বসেও একই কাজ করেছেন। যদিও নিয়ম অনুযায়ী নিজ নিজ ভোটকেন্দ্রে বসেই এসব হিসাব-নিকাশের কাজ সেরে সিলগালা করে তারপর রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ফলাফল হস্তান্তর করার কথা।
রাত আড়াইটায় নগরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পলাশপুর শাহজালাল প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আলকাজ উদ্দিন ওই কক্ষে বসে ব্যাগে করে নিয়ে আসা বিভিন্ন কাগজপত্র ঘেঁটে ফলাফল মিলিয়ে দেখেন। এ সময় সাংবাদিকেরা তাঁকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ?আসতে আসতে দেরি হয়ে গেছে। তাই তাড়াহুড়ো করে ফলাফল মিলিয়ে আনতে পারিনি।? তাঁর কেন্দ্র থেকে রিকশায় নির্বাচন কমিশনের অফিসে আসতে সর্বোচ্চ ৩০-৩৫ মিনিট সময় লাগার কথা।
হঠাৎ উপস্িথত হিরন: ভেতরে যখন এই অবস্থা চলছে, তখন রাত প্রায় পৌনে তিনটার দিকে আকস্িনকভাবে মেয়র পদপ্রার্থী হিরন সেখানে উপস্িথত হন। ঢুকেই তিনি তাঁর এজেন্টদের ডেকে বারান্দায় নিয়ে যান। উপস্িথত সংবাদকর্মীরাও ছুটে যান। হিরন ক্ষুব্ধ ও আবেগাপ্লুত হয়ে তাঁর এজেন্ট ও সংবাদকর্মীদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, ?আমি খবর পেয়েছি, আমার ফলাফল নিয়ে কারসাজি করা হচ্ছে। আমাকে হারিয়ে আরেকজনকে জিতিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এমনকি, বাইরে একজন প্রার্থীর পক্ষ থেকে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যে আমি ১২০০ ভোটে হেরে গেছি। কিন্তু আমার হিসাবমতে, আমি কিছুতেই হারতে পারি না।?
এ সময় হিরন আরও অভিযোগ করেন, ভোট গ্রহণের পর র্যাবের সদস্যরা এমন ছয়-সাতটি কেন্দ্রে তাঁর কর্মীদের লাঠিপেটা করেছেন, যেখানে তাঁর ভোট বেশি।
হিরন বলেন, ?এসব কারণে আমি এই ফলাফল মানতে পারি না। আমি ফলাফল প্রত্যাখ্যান করছি। বিষয়টি আমি টেলিফোনে ঢাকায় নির্বাচন কমিশনকেও জানিয়েছি।?
হিরন চলে গেলে তাঁর পক্ষে জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস লিখিতভাবে একটি অভিযোগপত্র জমা দেন রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে। এসব ঘটনা নিয়ে সেখানে তখন উত্তেজনা দেখা দেয়। র্যাব ও পুলিশের সদস্যরা তাৎক্ষণিক সতর্ক অবস্থান নেন।
প্রক্রিয়া দ্রুত হলো: ফলাফল প্রত্যাখ্যানের কথা বলে হিরন চলে যাওয়ার পর নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থার সৃষ্টি হয়। তাঁরা টেলিফোনে অনেকের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের কাছেও অনেক ফোন আসতে থাকে। রাত তিনটায় কমিশন মোট ৭৬টি কেন্দ্রের ফলাফলে জানায়, হিরনের ভোট ৩৮ হাজার ১২৩ এবং সান্টুর ৩৭ হাজার ১৯৩। এর মিনিট পনেরো পরই জানানো হয় ৮০টি কেন্দ্রের ফলাফল। তাতে হিরনের ভোট হয় ৪০ হাজার ৭৩৪ এবং সান্টুর ৪০ হাজার ৩৮০।
আবার ফোন, আবার বিরতি: টেলিফোন আসা-যাওয়া এ সময় আবার বেড়ে যায়। ফলে ফলাফল ঘোষণায় আবার ঘণ্টাখানেক বিরতি পড়ে। রাত সোয়া চারটার দিকে ঘোষণা করা হয় ৮৪টি আসনের ফলাফল। তাতে হিরনের ভোট হয় ৪২ হাজার ২৪৮ এবং সান্টুর ৪২ হাজার ১০৫।
এত বিলম্ব এবং ফলাফল প্রস্তুত করা নিয়ে বিশৃঙ্খলা, প্রার্থী হিরনের অভিযোগ ইত্যাদি বিষয়ে উপস্িথত সাংবাদিকেরা রিটার্নিং কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে চাইলে মনিরুল ইসলাম বলেন, কেন দেরি হচ্ছে তা তিনিও বুঝতে পারছেন না। তবে হিরনের অভিযোগ সঠিক নয়।
এসব কথা বলার সময় তাঁকে খুবই বিচলিত দেখাচ্ছিল। তিনি বলেন, ?কোনো ধরনের কারসাজির সুযোগ নেই। আর আমি তো আপনাদের সঙ্গে একই কক্ষে বসে আছি।?
এ সময় সাংবাদিকেরা দোতলার কক্ষে প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের ফলাফল প্রস্তুতের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বেশ উত্তেজিত হয়ে যান। তাঁর অনুমতি না নিয়ে ওপরের ওই কক্ষে যাওয়া এবং ছবি তোলার জন্য তিনি সাংবাদিকদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
পরে রাত সাড়ে চারটার দিকে ঘোষণা করা হয় মোট ৯০টি কেন্দ্রের ফলাফল। তখন হিরনের ভোট দাঁড়ায় ৪৬ হাজার ৪২৫ এবং সান্টুর ৪৫ হাজার ৬৪১।
একটি কেন্দ্রের রহস্য: এরপর বাকি মাত্র একটি কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে গড়িমসি করতে দেখা যায়। এই কেন্দ্রটি হচ্ছে ৪৯ নম্বর, বরিশাল পলিটেকনিক কলেজ কেন্দ্র, যা শুধু মহিলাদের জন্য নির্ধারিত। সেখানে ভোটার সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৭৪। আর ওই কেন্দ্রের অবস্থান নির্বাচন কমিশনের দপ্তর থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে।
দুরের সব কেন্দ্রের ফলাফল এসে গেলেও ওই কেন্দ্রেরটা আসতে দেরি হওয়ার কারণ নিয়ে উপস্িথত সাংবাদিক ও প্রার্থীরা প্রশ্ন তুললে রিটার্নিং কর্মকর্তা বিভিন্ন অজুহাত দেখাতে থাকেন। এভাবে প্রায় এক ঘণ্টা কেটে যায়।
ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশনের এক সুত্র থেকে সাংবাদিকেরা জানতে পারেন, ওই কেন্দ্রের ফলাফলও কমিশনের হাতে এসে পৌঁছেছে অনেক আগেই। আর সেটা যোগ করলে সর্বমোট ফলাফলে শওকত হোসেন হিরনই জয়ী হবেন। এ সময় এই খবর হিরনের এজেন্টদেরও কানে পৌঁছে যায়।
আবার হিরন: এর কিছুক্ষণের মধ্যেই হিরন আবার ছুটে আসেন নির্বাচন কমিশনের ওই কক্ষে। এসেই একটি কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণায় কেন দেরি হচ্ছে তা জানতে চান এবং সেটি ঘোষণার অনুরোধ করেন। এ সময় রিটার্নিং কর্মকর্তা ওই কেন্দ্রের ফলাফলের কপি ফাইলের ভেতর থেকে বের করে উপস্িথত সবাইকে দেখান।
আসেন সান্টু, শুরু বিতন্ডা: ঠিক এ সময়ই ঘটনাস্থলে আসেন আরেক মেয়র পদপ্রার্থী শরফুদ্দিন আহম্মেদ সান্টু। তিনি এসেই ফলাফল ঘোষণায় আপত্তি তোলেন। একপর্যায়ে তাঁর সঙ্গী লোকজন কিছুটা উত্তেজিত হয়ে উঠলে হিরনও উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। সান্টুও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এ সময় হিরন ও সান্টু দুজনই উত্তেজিত হয়ে একে অন্যের সঙ্গে ধমকের সুরে বাগ্বিতন্ডা শুরু করেন। তাৎক্ষণিকভাবে উপস্িথত পুলিশ কর্মকর্তারা দুজনের মাঝে অবস্থান নিয়ে তাঁদের শান্ত করেন। তবে সান্টু তাঁর দাবিতে অনড় থেকে বলেন, ?স্বাভাবিক ফলাফলে আমি বিজয়ী হয়েছি। এখন নির্বাচন কমিশন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ফলাফল পরিবর্তন করছে। এই ফলাফল আমি মানি না, এই ফলাফল ভুয়া, আমি ফলাফল প্রত্যাখ্যান করলাম।?
তিনি সাংবাদিকদের কাছেও একই কথা বলে অভিযোগ করেন, ?একটু আগে একজন প্রার্থী এসে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে যাওয়ার পর এখন তাঁর পক্ষে ফলাফল ঘোষণার বিষয়টি ষড়যন্ত্রমূলক। তাই আমি এই ফলাফল মানব না।?
এ সময় আবার কিছুটা উত্তেজনা দেখা দেয়। এ সময় রিটার্নিং কর্মকর্তা পলিটেকনিক কলেজ কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে ডেকে আনার জন্য লোক পাঠান।
আবার ফোন, গড়িমসি: প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আসার পরের ঘটনাগুলোর পরও সামগ্রিক ফলাফল ঘোষণায় গড়িমসি করতে থাকেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। এ সময় তিনি আবার দফায় দফায় বিভিন্নজনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। বাইরে থেকেও তাঁর কাছে আসতে থাকে একের পর এক ফোন। এসব ফোনের কোনো কোনোটি যে ঢাকার নির্বাচন কমিশন থেকে, তা উপস্িথত সবাই বুঝতে পেরেছেন। কিন্তু অধিকাংশ ফোন কার তা বোঝা যায়নি। একপর্যায়ে তিনি সামগ্রিক ফলাফলের তালিকাটি নিয়ে অন্য কক্ষে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ফোনালাপ করেন।
এরপর কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল পুনরায় পরীক্ষানিরীক্ষা করান। হিরন ঠায় বসে থাকেন ওই কক্ষে। সেই সঙ্গে বাইরে অপেক্ষায় থাকেন তাঁর কয়েক শ কর্মী-সমর্থক।
নাটকের যবনিকা: বরিশালে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার প্রায় ২৬ ঘণ্টা পর গতকাল মঙ্গলবার বিকেল পাঁচটায় আনুষ্ঠানিকভাবে বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করা হয়। নির্বাচন কমিশন সুত্র জানায়, অ্যাডভোকেট শওকত হোসেন হিরন পেয়েছেন ৪৬ হাজার ৭৯৬ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সরদার শরফুদ্দিন আহম্মেদ সান্টু পেয়েছেন ৪৬ হাজার ২০৮ ভোট। হিরন ৫৮৮ ভোটে বিজয়ী হয়েছেন।
ফল ঘোষণার পর বিজয়ী হিরন বলেন, ?আমি সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করে যাব বরিশালবাসীকে দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি পর্যায়ক্রমে পালন করার জন্য।
ফলাফল ঘোষণার কিছু আগে এস শরফুদ্দিন আহম্মেদ সান্টু নির্বাচন কমিশনে একটি লিখিত অভিযোগপত্র জমা দেন। এতে তিনি ওই নির্বাচনের ফলাফল স্থগিত ও পুনরায় ভোট গ্রহণের আবেদন জানান। তিনি তাঁর বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, তাঁর আবেদনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়েই নির্বাচন কমিশন উদ্দেশ্যমূলকভাবে আরেক প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করেছে। নির্বাচন কমিশন যদি তাঁর অভিযোগের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তবে তিনি প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নেবেন।
রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন: মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, তিনি বিধিগতভাবে ফলাফল ঘোষণা করেছেন। তবে একজন প্রার্থী ফলাফল স্থগিত ও পুনরায় ভোট গ্রহণের অভিযোগ করলেও এ বিষয়টি তাঁর ক্ষমতার বাইরে।
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণায় কেন বিলম্ব হলো, আসলে কী ঘটেছিল−প্রথম আলোর এমন প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, ?কিছু আহাম্মক লোক থাকলে যা হয়, তা-ই হয়েছে। পলিটেকনিক কলেজ কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ব্যালটবাক্স ও কাগজপত্রের বস্তাসহ সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম কন্ট্রোল রুমে রেখেই চলে যান। সেখানে একটি টেবিলের ওপর ওই কেন্দ্রের ফলাফলের তালিকাও রেখে যান তিনি। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা দেখেছেন, এগুলো সেখানে রেখে তিনি কন্ট্রোল রুমে ঢোকেন। এতে কর্মকর্তারা মনে করেন, তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। কিন্তু বাস্তবে ফলাফল জমা দেওয়ার দীর্ঘ সারি দেখে তিনি বাসায় চলে যান। বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। পরে রাত চারটায় পুলিশ পাঠিয়ে তাঁকে আবার কন্ট্রোল রুমে ডেকে আনার পর সব বিষয় পরিষ্ককার হয়ে যায়।?
আপনার মন্তব্য দিন
You must be logged in to post a comment.