08th Aug 2008
এইডস প্রতিরোধ ও চিকিৎসা
<<<মিক্সকো সিটির এইডস সম্মেলনে …
গত সোমবার থেকে শুরু করে শুক্রবার পর্যন্ত, মেক্সিকো সিটিতে হয়ে গেল বিশ্ব এইডস নিয়ে এক বিশাল সম্মেলন৷ ভিন্ন ভিন্ন দেশে এই মারণব্যাধি প্রতিরোধের ব্যবস্থা কতোটা এগিয়ে গেছে - সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে সেখানে৷
দেখা যাচ্ছে যে ভারত-বাংলাদেশে এইডস ছড়িয়ে পড়েছে ভয়ংকরভাবে ভাবে৷
এইডস কি?
Acquired Immune Deficiency Syndrome সংক্ষেপে AIDS হল HIV নামক ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট এক ব্যাধি, যা মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা হ্রাস করে দেয়৷ তখন রোগীর শরীর অসহায় ভাবে আত্মসমর্পণ করে সরল-সহজ জীবাণুর সংক্রমণের কাছে৷ এতে করে, একজন এইডস রোগী খুব সহজেই যে কোন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারেন, যা শেষ পর্যন্ত ঘটাতে পারে মৃত্যুও৷
দেহ প্রতিরোধী যে কোষগুলির মধ্যে HIV ভাইরা ছড়ায়, সেগুলি হল একধরনের শ্বেতকণিকা - টি কোষ বা EU4 কোষ৷ বলা হয়, HIV সংক্রামিত মানুষদের দেহে এই কোষ গণনা যখন ২০০-র নীচে পৌঁছোয়, তখনই সূচনা হয় এইডস রোগের৷ মনে রাখতে হবে, যে এইডস কেবল একটি রোগ নয়, কয়েকটি রোগের সমষ্টিস্বরূপ৷ তারজন্য এর নামকরণ করা হয়েছে ‘সিনড্রোম’ বা ‘রোগসমষ্টি’৷
এইডস প্রতিরোধে জনসচেতনতা জরুরী
আর তাই এইডস নিয়ে মানুষের মধ্যে ভয় যেমন কাজ করে, কাজ করে অজ্ঞতাও৷ HIV সংক্রমণের সঙ্গে সঙ্গেই যে এইডস হয়না, একথা আমাদের মধ্যে অনেকেই হয়ত জানেন না৷ তবে একবার HIV ভাইরাস শরীরে ঢুকলে যেহেতু তাকে পুরোপুরি দূর করা এখনো পর্যন্ত সম্ভব হয়নি, তাই HIV সংক্রমণ হলে আজ নয় কাল এইডস প্রায় অনিবার্য - একথা বোধ হয় বলাই যায়৷
অবশ্য, একজন HIV ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের বিনা চিকিৎসায় এইডস পর্যায়ে পৌছোতে যদি গড়ে দশ বছর লাগে, তবে চিকিৎসা করা হলে এইডস রোগটি আরো কিছু বছর পিছিয়ে দেওয়া যায়৷
এইডস কিভাবে ছড়ায়
সাধারনভাবে বলতে গেলে এইডস ছড়িয়ে থাকে,
· HIV-তে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত গ্রহণ করলে বা তার ব্যবহৃত ইনজেকশনের সিরিঞ্জ বা সূঁচ ব্যবহার করলে৷
· HIV-তে আক্রান্ত গর্ভবতী মায়ের শিশুর ভেতরেও আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা গর্ভধারণের শেষদিকে বা প্রসবের সময় হতে পারে৷
· HIV-তে আক্রান্ত কারো সঙ্গে অসংরক্ষিত যৌন সম্পর্ক করলে৷
আসলে শরীর জাত অধিকাংশ তরল ক্ষরণেই HIV ভাইরাস নিষ্কৃত হয়৷ তবে আমাদের শরীরে সাধারনত স্নেহপদার্থের আবরণ থাকায়, HIV শরীরের বাইরে বেশীক্ষণ বাঁচেনা৷ আর সে কারণেই, সরাসরি রক্ত বা যৌন নিঃসরণ শরীরে প্রবেশ না করলে HIV সংক্রমণের সম্ভাবনা খুবই কম৷ কাজেই, শুধুমাত্র স্পর্শ, একসঙ্গে এক থালায় খাওয়া, এক জামাকাপড় পরা অথবা মশার কামড়ে কখনো HIV ছড়ায়না৷ সুতরাং, HIV সংক্রমণ মোটেই ছোঁয়াচে নয়৷
মেক্সিকো সিটিতে বিশ্ব এইডস সম্মেলন
মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত ১৭-তম বিশ্ব এইডস সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি-মুন৷ তিনি বলেন, যে এইডস প্রতিরোধে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশই এখনো পিছিয়ে৷ সুতরাং এর জন্য ২০১০ সালের মধ্যে এইডস প্রতিরোধ, তার চিকিৎসা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করা পশ্চিমাবিশ্বের অন্যতম কর্তব্য৷ এছাড়াও, বান HIV ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের প্রতি বৈষম্য বন্ধ করার ডাক দেন৷
এদিকে, HIV ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষদের চিকিৎসার সুযোগ দিতে মেক্সিকো এইডস রোগের ওষুধের ক্ষেত্রে মুক্ত বাণিজ্যের অনুমতি দেবে বলে জানা গেছে৷ সম্মেলনে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ফেলিপে কালদেরোন ঘোষণা করেন, যে তিনি মূল ওষুধের নকল আমদানী করতে দেবেন, যা মেক্সিকোতে উৎপাদিত হয় না৷ তাছাড়া চলতি বছরে মেক্সিকো এইডস রোগের মোকাবিলা করতে প্রায় ২০ কোটি ইউরো ব্যয় করবে বলেও তিনি জানান৷ কালদেরোনের এই ঘোষণাকে স্বাগত জানায় Doctors without borders নামক সংগঠনটি৷ মেক্সিকো সিটিতে আয়োজিত ঐ সম্মেলনে প্রায় ২৫ হাজার ডাক্তার, বিজ্ঞানী, রাজনৈতিক নেতা ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন৷ জাতিসংঘের অনুমান অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ HIV ভাইরাসে আক্রান্ত - যাদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই আফ্রিকায় বসবাস করে৷
কিন্তু, উন্নত বিশ্বের অবস্থাও আশানুরূপ নয়৷ যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর কমপক্ষে ৫৬ হাজার মানুষ এইডস রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র বা CDC৷ তারা অবশ্য এও জানিয়েছে, যে প্রকৃত রোগীর সংখ্যা যদি নাও বা বেড়ে থাকে, রোগ নির্ণয়ের আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন পদ্ধতির ব্যবহারের ফলে তা আগের থেকে আপাতদৃষ্টিতে বেড়ে গেছে বলেই মনে হচ্ছে৷ রোগ নির্ণয়ের এই নতুন পদ্ধতি ব্যবহারের পর দেখা যাচ্ছে, যে আগের থেকে এই হার ৪০ শতাংশ বেশি৷ CDC জানায় যে আমেরিকায় কমবেশি প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ HIV আক্রান্ত৷ এর মধ্যে প্রতিবছর ১৫ থেকে ১৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে৷
দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থাও তথৈবচ৷ বাংলাদেশ এবং ভারতেও এর বিস্তার থেমে নেই৷ বাংলাদেশে অন্তত আট হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত বলে এ পর্যন্ত পাওয়া হিসাবে দেখা গেছে৷ আর ভারতে এই সংখ্যা প্রায় ২৫ লক্ষ৷ সম্মেলনে জানানো হয়, যে এইডস-এর বিরুদ্ধে যে যুদ্ধে নামা হয়েছে, সেই যুদ্ধে সেনানী অর্থাৎ চিকিৎক ও স্বাস্থ্য কর্মীর প্রচন্ড অভাব৷ বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলিতে৷ আর সে জন্যই, ভারত-বাংলাদেশের মতো দেশগুলিতে সচেতনতা এবং চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে এইডস-এ আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে৷
এইডস রোগের চিকিৎসা হয় ঠিকই, তবে এই রোগ নিরাময় হয় না৷ তার উপর এ চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, টিকা আবিষ্কারও সুদূরপরাহত৷ তাই প্রতিরোধই এর প্রধান উপায়৷ নিরাপদ যৌনমিলন, কনডম ব্যবহার, অনিরাপদ রক্তভরণ না নেওয়া, ডিসপোজেবল সুচ ও সিরিঞ্জ-এর ব্যবহার, সেলুনে নতুন রেজর বা ব্লেড ব্যবহার করা, গর্ভধারণের আগে সংক্রামিত মায়ের চিকিৎসার জন্য পরামর্শ নেওয়া - ইত্যাদি ব্যাপারে অংশ নিতে হবে আপনাদের-আমাদের সকলকেই৷ তবেই সম্ভব হবে এই কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা৷
-দেবারতি গুহ
আপনার মন্তব্য দিন
You must be logged in to post a comment.