02nd Dec 2008
আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও বিশ্বশান্তির পথ
ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের মধ্যে বাড়তে থাকা ব্যবধান ঘোচানো, সভ্যতাগুলোর সঙ্ঘাত রোধ ও বিশ্বে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তঃধর্মীয় সংলাপের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। বিশ্বের প্রতিটি শান্তিপ্রিয় মানুষই তা সমর্থন করে। এই প্রয়োজন সামনে রেখে গত মার্চ মাসে খাদেমুল হারামাইন বাদশাহ আবদুল্লাহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর মধ্যে সংলাপের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ ব্যাপারে তিনি মুসলিম ওলামায়ে কেরামের সাথে মতবিনিময় করে আন্তঃধর্মীয় সংলাপের জন্য তাদের অনুমোদন নেন। তিনি জুন মাসে মক্কা মুয়াজ্জামায় একটি সম্মেলনের আয়োজন করেন। এতে তিনি ইসলামি নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে অন্যান্য ধর্মের নেতার সাথে সংলাপ করেন। এই চিন্তাধারার ফলে জুলাই মাসে মাদ্রিদে আন্তর্জাতিক আন্তঃধর্মীয় সংলাপ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে সারা বিশ্ব থেকে প্রায় ৩০০ প্রতিনিধি যোগদান করেন। সম্মেলনে সারা বিশ্বের ধর্মগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক, সংলাপ ও সহযোগিতার ওপর জোর দেয়া হয়, যাতে বিশ্ব থেকে ও উগ্রপন্থার অবসান সম্ভব হয়। বিভিন্ন মহাদেশ থেকে আগত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতারা এ ব্যাপারে নিয়মতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার প্রথম সুযোগ পান। দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে নিউইয়র্কে। এর শিরোনাম ছিল ‘শান্তি এবং আন্তঃধর্ম ও সংস্কৃতি সংলাপ’। এটাও সৌদি আরবের বাদশাহ আবদুল্লাহর প্রচেষ্টার ফসল। এ সম্মেলন ১২ ও ১৩ নভেম্বর জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে ৮০টি দেশ থেকে আগত দুই শতাধিক প্রতিনিধি ধর্ম ও সভ্যতাগুলোর মধ্যে বাড়তে থাকা সেই ব্যবধান ঘোচানোর ওপর জোর দেন, সভ্যতাগুলোর সঙ্ঘাতের কারণ হচ্ছে। এ উপলক্ষে ২০ জন রাষ্ট্রপ্রধান ভাষণ দেন। প্রত্যেক বক্তাই এ মর্মে জোর দেন যে, বিশ্বের প্রতিটি ধর্মই শান্তি ও সহিষ্ণুতা শিক্ষা দেয়। বেশির ভাগ মুসলিম বক্তা পাশ্চাত্যের নীতির সমালোচনা করে বলেন, তাদের অজ্ঞতাই ইসলামের সাথে অন্যায় আচরণের কারণ। তারা আরো বলেন, বিশ্বের ১৩০ কোটি মুসলমান প্রশ্ন করছে পাশ্চাত্য এক দিকে সাম্য, পরস্পরের সম্মানবোধ, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও ধর্মগুলোর সম্মানের কথা বলছে। অন্য দিকে তারা দ্বিমুখী মানদণ্ডে কেন বিচার করছে? ইসলামের ব্যাপারে পাশ্চাত্যের অসহিষ্ণুতাই এ ক্ষেত্রে বড় প্রমাণ। তেমনি অন্য ধর্মের নেতারা তাদের ভাষণে এ মর্মে অভিযোগ করেন যে, ইসলামি বিশ্বে অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নেই। তাদের বিশেষ ইঙ্গিত ছিল সৌদি আরবের দিকে। তারা অভিযোগ করেন, সেখানে অন্য ধর্মাবলম্বীদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নেই।
জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের যে হলে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে এমন দৃশ্য ইতঃপূর্বে দেখা যায়নি। আগে দেখা গেছে, সেখানে একে অপরের কড়া সমালোচনা করছেন কিংবা ভাষণের মাঝখানে ওয়াক আউট করছেন। কিন্তু এবার সব নেতা একে অপরের কথা মনোযোগের সাথে শুনেছেন এবং প্রভাবিত হয়েছেন। সৌদি বাদশাহ পৃথিবীর সব মানুষ ও দেশের প্রতি শান্তি, সম্প্রীতি ও সহিষ্ণুতার বিস্তারে সহযোগিতার আহ্বান জানান এবং বলেন, সন্ত্রাসবাদ বিশ্বের সব ধর্ম ও সভ্যতারই শত্রু। এ জন্য সব জাতিকে তা মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেজ তার প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন এবং আশা প্রকাশ করেন, তার এ প্রচেষ্টা সমগ্র বিশ্বের দাবিতে পরিণত হবে। আর এটারই এখন অত্যন্ত প্রয়োজন। সম্মেলনের বিশেষ পর্ব ছিল ঐতিহাসিক নৈশভোজ। ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেজ ও সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী দেশের নেতারা এতে একই ঘরে আহার গ্রহণ করেন। দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের সমাপ্তি অধিবেশনে সদস্য দেশগুলোর প্রতি জোর দেয়া হয় তারা যেন মানবাধিকারের সম্মান করেন এবং নাগরিকদেরকে তাদের ধর্ম ও বিশ্বাস লালনের অনুমতি দেন। সম্মেলনে ধর্মকে সন্ত্রাসবাদের কাজে ব্যবহারের তীব্র বিরোধিতা করা হয়।
জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বান কি মুন এ উপলক্ষে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, এ সম্মেলনের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের ও বিশ্ব নেতৃবৃন্দের পরস্পর মতবিনিময় ও যৌথ কর্মসূচি গ্রহণের পথ সুগম হলো এবং এতে বিশ্বে আরো সম্প্রীতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা পাওয়া যাবে। সম্মেলনে আন্তর্জাতিক অসহিষ্ণুতা, উগ্রতা ও যুদ্ধ উন্মাদনার প্রতীক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশও ভাষণ দেন এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতিকে গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর সাধারণ কর্মপন্থা রূপে সাব্যস্ত করেন। তার পক্ষ থেকে ধর্মীয় সম্প্রীতি, সহিষ্ণুতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা ঠিক তেমনই ছিল, যেমন একটি হিংস্র বাঘের মুখে কোনো দুর্বল নিরীহ প্রাণীর টাটকা রক্ত লেগে আছে। আর সে শান্তির ওপর বক্তৃতা করছে। এ সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা হয়, যা সব ধর্মে সাধারণভাবে রয়েছে। ইসলামের ক্রমবর্ধমান প্রসারে ভীত, ইউরোপীয় দেশগুলোতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অসহিষ্ণুতা বেড়ে চলেছে এবং বেশ ক’টি দেশ স্কুল, ইউনিভার্সিটি, অফিসসহ প্রকাশ্য স্থানে মহিলাদের মাথায় ওড়না পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে, যা অসহিষ্ণুতার আলামত। ভারতে অনেক দিন ধরে মুসলমানদের সাথে অন্যায় আচরণ করা হচ্ছে এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর থেকে এ পর্যন্ত মুসলমানদের হত্যার বেশ ক’টি ঘটনা ঘটেছে। যেমন গুজরাটে মুসলমানদের হত্যার ঘটনা। এখনো অধিকৃত কাশ্মীর ও আসামে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন ও বর্বরতা কমছে না। তা ছাড়া মুসলমানদের পরম সম্মানিত ব্যক্তিদের মর্যাদাহানির ধারা অব্যাহত রয়েছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অবমাননাকর কাটুêন প্রচার, গুয়ানতানামো ঘাঁটি ও আবুগারিব কারাগারে কুরআন মজিদের অমর্যাদা, মুসলমান বন্দীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন, ডক্টর আফিয়া সিদ্দিকীর সাথে নির্দয় ব্যবহার, চলচ্চিত্রে কুরআনুল কারিম ও ইসলামের অবমাননা, মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভিডিও গেমস, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্র হরণকারী কুখ্যাত সালমান রুশদিকে নাইট খেতাব দেয়া, ইরাকে পবিত্র স্থানগুলোর অসম্মান ইত্যাদি মিলিয়ে শত শত নয়, হাজার হাজার ঘটনা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। এ ধরনের নির্যাতন এবং শান্তি কামনা পরস্পরবিরোধী। বুশের নীতিগুলোই বিশ্বে চরমপন্থা বিস্তারের কারণ। যদি তার উগ্রপন্থার নীতি বহাল থাকে, তাহলে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সহিষ্ণুতার বিস্তার কেবল কামনা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে। পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য আরো প্রয়োজন কোনো ধর্মের পবিত্র ব্যক্তিত্বদের এবং সম্মানিত স্থানগুলোর অসম্মানকে আন্তর্জাতিক অপরাধ সাব্যস্ত করা। এ ধরনের ঘটনা থামানোর জন্য জাতিসঙ্ঘকে প্রস্তাব গ্রহণ করতে হবে এবং স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের নামে এটাকে শাস্তিযোগ্য সাব্যস্ত করতে হবে। তাহলে এর পুনরাবৃত্তি ব হবে।
ধর্ম ও সভ্যতাগুলোর মধ্যে পার্থক্য থাকবেই। কিন্তু যদি তা থেকে অসহিষ্ণুতা জন্ম নেয়, তাহলে যুদ্ধ ও খুনখারাবির কারণ ঘটে।
এখন বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সামনে দু’টি পথ খোলা। তারা চাইলে সভ্যতাগুলোর মাঝখানে সমঝোতার সেতুবন রচনা করতে পারেন। কিংবা কঠোরতা ও পরস্পর ঘৃণার নীতি বহাল রাখতে পারেন। তারা বিশ্বের বিভিন্ন সমাজকে শান্তি ও পারস্পরিক মর্যাদা প্রদর্শন এবং ঘৃণা ও বিরূপ আচরণ দূর করার নীতি অবলম্বনে পথ প্রদর্শন করতে পারেন।
লেখকঃ ইশতিয়াক বেগ, পাকিস্তানের উর্দু দৈনিক জঙ্গ-এর কলামিস্ট। ভাষান্তর- লিয়াকত আলী
আপনার মন্তব্য দিন
You must be logged in to post a comment.