13th Jul 2009
মইনের বিরুদ্ধে টুকুর ১শ’ কোটি টাকার মামলা: বাড়ি কেন ক্রোক হবে না - আদালতের নোটিশ
মিথ্যা ও মানহানিকর বক্তব্য দিয়ে ১শ’ কোটি টাকার সুনাম ক্ষুণ্ণ করার অভিযোগে সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল (অব.) মইন উ আহমেদের নামে জোট সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ক্ষতিপূরণের মামলা করেছেন। গতকাল রোববার ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ঢাকার তৃতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ক্ষতিপূরণ বাবদ ১শ’ কোটি টাকা দাবি করে বিবাদি মইন উ আহমেদের বিরুদ্ধে ওই দেওয়ানি মামলা করেন। বিচারক এসএম সাইফুল ইসলাম বাদির মামলা গ্রহণ করে বিবাদির প্রতি সমন জারি করেছেন। এছাড়া বাদির অন্য একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিবাদি মইন উ আহমেদের মালিকানাধীন বারিধারা ডিওএইচএসের ৫ কাঠা জমির ওপর ৬ তলা বাড়ি কেন মামলার রায় ঘোষণার আগে ক্রোক হবে না, এ ব্যাপারে ৩ সপ্তাহের মধ্যে তাকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আগামী ১৬ আগস্ট এ মামলায় বিবাদি মইন উ আহমেদকে মামলার বিষয় অবহিত করে ফেরত প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।
গতকাল সকাল ১০টায় হাসান মাহমুদ টুকু তার আইনজীবী মো. তাহেরম্নল ইসলাম তৌহিদের মাধ্যমে আদালতে উপস্থিত হয়ে তৃতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতের সেরেসত্দাদারের কাছে এফিডেভিট করেন। বাদি মামলায় সর্বোচ্চ কোর্ট ফি ৪০ হাজার ৫শ’ টাকা জমা দেন। ১৫ পাতার মামলার আরজিতে বাংলাদেশ সরকার পক্ষে তৎকালীন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে মোকাবেলা বিবাদি করা হয়েছে। বাদি পৃথক একটি আবেদন করে আদালতে জানান, তার ক্ষতিপূরণের মামলায় ১শ’ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ পাবেন। সেক্ষেত্রে তিনি মামলায় জেতার পর (ডিক্রি লাভ) বিবাদি যাতে তার মালিকানাধীন ডিওএইচএসের বাড়ি অন্যত্র হসত্দানত্দর করতে না পারেন সেজন্য মামলার রায় ঘোষণার আগে ওই বাড়িটি ক্রোক করার জন্য আদালতের কাছে পৃথক একটি আবেদন করেন। ওই আবেদনের ওপর দুপুর ২টায় শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
বাদি টুকুর উপস্থিতিতে সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ মামলার বিষয়ে আদালতে শুনানি করেন। এ সময় বিএনপি সমর্থিত শতাধিক আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ তার শুনানিতে বলেন, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জরম্নরি অবস্থা চলার সময় রাজনীতিবিদদের বিরম্নদ্ধে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চালানো হয়। বিনা তদনত্দে তাদের গ্রেফতার করা হয়, তাদের ওপর অকথ্য অত্যাচার করা হয়। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। বাদি ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, তার স্ত্রী রোমানা মাহমুদ ও অবিবাহিত মেয়েকে গ্রেফতার করে নির্যাতন করা হয়েছে। এসব কাজে ইন্ধনদাতা ছিলেন সাবেক সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ। ব্যারিস্টার মওদুদ আরও বলেন, বিবাদি ২০০৭ সালের ২৭ মার্চ তেজগাঁওয়ের পুরনো বিমানবন্দরের জাতীয় প্যারেড স্কোয়ারে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সামরিক-বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাদের সৌজন্যে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার উপস্থিতিতে মনগড়া মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে বলেন, গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতে ২০ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট করা হয়েছে এবং বিদেশে পাচার হয়েছে। বিবাদি মইন উ আহমেদ মিথ্যা বক্তব্য দিয়ে জনসম্মুখে বাদি টুকুকে হেয় করেছেন। বাদি প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে তার মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত বিষয়ে তাকে অভিযুক্ত করে কোন মামলা হয়নি। তিনি আরও বলেন, বিবাদি মইনের দাপটে দেশের মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ভাল ছিল না। জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া তারা দেশ চালিয়েছেন ও রাজনীতিবিদদের হয়রানি করেছেন। ব্যারিস্টার মওদুদ আরও বলেন, বিবাদি মইন উ আহমেদ ইতোমধ্যেই দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। বাদির করা ১শ’ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের মামলার রায় তার পক্ষে যাবে। বিবাদি মামলা চলাকালে তার মালিকানাধীন বারিধারার বাড়িটি হসত্দানত্দর করে ফেলতে পারে। তাই মামলা চলাকালে রায়ের আগে বিবাদির মালিকানাধীন বারিধারা ডিওএইচএসের নরদান রোডের ১০৬ নম্বর বাড়িটি যেন তিনি হসত্দানত্দর করতে না পারেন সেজন্য বাদির বাড়িটি ক্রোক করার আবেদন করেন এ আইনজীবী।
বিচারক এসএম সাইফুল ইসলাম শুনানি শেষে জেনারেল মইনের ওই বাড়ি কেন রায় ঘোষণার আগে ক্রোক করা হবে না সে মর্মে কারণ দর্শানোর জন্য বিবাদি মইন উ আহমেদকে ৩ সপ্তাহের মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেন। এছাড়া আগামী ১৬ আগস্ট এ মামলায় বিবাদি জেনারেল মইনের বিরম্নদ্ধে জারি করা সমন ফেরত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। আদালতে শুনানির সময় ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে সহায়তা করেন ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, লুৎফে আলম, সানাউলস্নাহ মিয়া, মহসীন মিয়া, খোরশেদ আহমেদ, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, মো. ইকবাল হোসেন, শামীমা আক্তার শাম্মী, শাহিনা হক বিউটি, জয়নাল আবেদিন মেজবাহ প্রমুখ আইনজীবী।
মামলার আরজিতে যা বলা হয় : বাদি ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর মামলাটি দেওয়ানি মামলা নম্বর ১৪২/২০০৯ হিসেবে নম্বরভুক্ত হয়। বাদি তার মামলার আরজিতে উল্লেখ করেন, বিবাদি জেনারেল মইন গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় বিষয়ে ২০ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের যে অভিযোগ আনেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ৫ বছরের জন্য বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সর্বমোট বাজেট ছিল প্রায় ১৩ হাজার ৫শ’ কোটি টাকা। গত ৫ ফেব্রম্নয়ারি বর্তমান বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় সংক্রানত্দ এক প্রশ্নের জবাবে জাতীয় সংসদকে জানান, গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতে সর্বমোট বাজেটের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩ হাজার ৫শ’ কোটি টাকা। আর এ থেকেই প্রমাণিত হয়েছে বিবাদির দেয়া বক্তব্যটি ছিল মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। বাদি আরও বলেন, বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের তথাকথিত দুর্নীতি ও টাকা পাচারের যে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয় তাতে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে এর দায়দায়িত্ব তার ওপর বর্তায়। বিবাদির অভিযোগের ফলে বাদি টুকুর সুনাম দেশ-বিদেশসহ আপামর জনগণের কাছে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। তাই বাদি তার রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুণ্ন করার জন্য ২০ কোটি টাকা, পারিবারিক সুনামের ক্ষতিপূরণ বাবদ ২০ কোটি টাকা, ব্যবসায়ের প্রত্যক্ষ ক্ষতির জন্য ৪০ কোটি টাকা ও ব্যবসায়ের সুনামের ক্ষতির জন্য ২০ কোটি টাকাসহ সর্বমোট ১শ’ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ বাবদ আদায়ের জন্য বিবাদি মইনের বিরম্নদ্ধে মামলাটি করেছেন বলে মামলায় উলেস্নখ করেন। বাদি মামলায় আরও উলেস্নখ করেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআরের করা মিথ্যা মামলায় তিনি দীর্ঘদিন কারাভোগ করে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর কারামুক্ত হন। কারামুক্ত হয়ে তিনি দীর্ঘদিন অসুস্থ অবস্থায় বিদেশে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাই বিবাদি মইনের বিরম্নদ্ধে যথাসময়ে মামলাটি করতে পারেননি। আদালতে এ সময় তার সমর্থকরা ভিড় করেন ও আদালত অঙ্গন ত্যাগ করার সময় স্লোগান দেন।
আপনার মন্তব্য দিন
You must be logged in to post a comment.