17th Jul 2009

৩৩ জনের মধ্যে দু’জন মতামত দেন: যুদ্ধাপরাধ আইন সংশোধনে বিশেষজ্ঞরা মতামত দেয়ার প্রয়োজনবোধ করেননি!

নাজমুল আহসান রাজু : যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আলোচিত ১৯৭৩ সালের ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম (ট্রাইব্যুনাল) এ্যাক্ট কার্যকর করতে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়ার সরকারি উদ্যোগে সাড়া মিলেনি। সরকারের আইন কমিশন ৩৩ জন বিশেষজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে মতামত চেয়ে চিঠি দেয়ার পর দুজন ছাড়া কেউই মতামত প্রদানে প্রয়োজনবোধ করেননি। সময়ের বিবেচনায় আইনই হয়তো তাদের কাছে অপ্রয়োজনীয় প্রতীয়মান হয়েছে বা সরকারের অসময়োচিত উদ্যোগকে তারা সমর্থন করতে পারেননি, ফলে সরকারকে যেনতেনভাবে একটি সংশোধনী আইন জাতীয় সংসদে উত্থাপন করে সেটিকে আইনে পরিণত করতে হয়েছে। গত ৯ জুলাই দি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) (সংশোধন) বিল ২০০৯ সংসদে তড়িঘড়ি করে পাস করা হয়। স্বাধীনতার পরপরই মুক্তি যুদ্ধকালীন অপরাধের বিচারের দালাল আইনের অধীন যে বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হয় ঐ আদালতের প্রধান প্রসিকিউর এবং ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ একজন সিনিয়র আইনজীবী বলেছেন, ৩৮ বছর পর যুদ্ধাপরাধের বিচার করা সম্ভব নয়। সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জনগণের আইওয়াশ করেছে মাত্র। সরকারের পক্ষে যুদ্ধাপরাধের বিচার করা সম্ভব নয় বলে তিনি এই প্রতিবেদককে জানান। নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর চারদিন পর ২৯ জানুয়ারি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এরপর প্রসিকিউসন ও তদন্ত সেল গঠনের কয়েক দফা ঘোষণা দেন সরকারের আইনমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। এ নিয়ে সরকার শুরু থেকে ১৯৭৩ সালের ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনাল) এ্যাক্টে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ঘোষণা দিয়ে আসছে। কিন্তু আইনটিতে মানবাধিকার ও ন্যায় বিচার পরিপন্থী বিধান থাকায় দেশী ও বিদেশী মহলে সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। সরকারের টনক নড়লে শেষ পর্যন্ত আইনের সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়। চলতি বছরের ১৭ মে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় যুদ্ধাপরাধের বিচারে ১৯৭৩ সালের আইনটি সংশোধনের জন্য কমিশনকে চিঠি দেয়। এই চিঠির প্রেক্ষিতে আইনটি যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে পর্যালোচনার মাধ্যমে মতামত চেয়ে ৩৩ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে চিঠি দেয় আইন কমিশন। চিঠির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনের একটি ফটোকপিও দেয়া হয়েছিল। আইন কমিশন যাদের কাছে মতামত চেয়েছে তারা হলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসাইন, হাবিবুর রহমান, এটিএম আফজাল ও মোস্তফা কামাল, আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি গোলাম রাববানী, বিচারপতি কাজী এবাদুল হক। সিনিয়র আইনজীবী সাবেক বিচারপতি টিএইচ খান, ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার রফিকউল হক, খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমাদ, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি,সাবেক এটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম, শেখ রাজ্জাক আলী, ড. এম জহির, আব্দুল বাসেত মজুমদার, ব্যারিস্টার এম আমীর উল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক, ব্যারিস্টার আকতার ইমান, আবদুর রেজ্জাক খান, খান সাইফুর রহমান, ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজ, সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি ও ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সম্পাদক, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চেয়ারম্যান, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ল’ এর ডীন ড. শাহদীন মালিক এবং বিলিয়া চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান।
আইন কমিশনের সচিব এ.এফ.এম আমিনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয় জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে সরকার ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) এ্যাক্ট ১৯৭৩ এর অধীন ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আইনটির প্রায়োগিক দিক সম্পর্কে পুক্মখানুপুক্মখভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা পূর্বক আইনটি যুগোপযোগী করণের লক্ষ্যে কোন সংশোধন প্রয়োজন আছে কিনা, থাকলে সংশোধনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবসহ সামগ্রিক বিষয়ের ওপর জরুরি ভিত্তিতে কমিশনের সুপারিশ সরকার বরাবর প্রেরণের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। সুপারিশ চূড়ান্ত করার আগে অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানের সুচিন্তিত মতামত গ্রহণের প্রয়োজন মনে করছে কমিশন। আইন সম্পর্কে আপনার কোন মতামত থাকলে ১১ জুনের মধ্যে কমিশনকে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করা গেল।
আইন কমিশনের বেঁধে দেয়া সময়ে ৩৩ জনের মধ্যে আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি কাজী এবাদুল হক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ডীন ড. এম শাহ আলম মতামত দেন। স্বতপ্রণোদিত হয়ে সত্য মত দেন আরো এক ব্যক্তি। মতামত দেয়ার পর পরই ড. এম শাহ আলমকে সরকার আইন কমিশনের সদস্য নিযুক্ত করে।
আইন কমিশন যাদের কাছে মতামত চেয়েছে তাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবী। ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম ১৯৭৩ সালের যুদ্ধাপরাধ আইন প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত থাকলেও মতামত দেননি। পর্যবেক্ষক মহলের মতে ৩৩ জনের মধ্যে দু’জনের মতামত প্রদানের মাধ্যমে এটা স্পষ্ট যে হয় তারা আইনটিকে সংশোধনে মতামত দেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি অথবা তারা সরকারের অসময়োচিত উদ্যোগকে সমর্থন করেনি। শেষ পর্যন্ত গত ২৪ জুন আইন কমিশন একটি সুপারিশ তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে। মন্ত্রী পরিষদে নীতিগতভাবে অনুমোদানের পর গত ৯ জুলাই বিল আকারে সংসদে পাস হয়েছে।

তারিখ: ১৫ জুলাই ২০০৯

আপনার মন্তব্য দিন

You must be logged in to post a comment.