02nd Jan 2010

২০০৯-এ ক্রসফায়ারে নিহত সবচেয়ে বেশি ২২৯ জন ১৭৫ সাংবাদিক নির্যাতিত, নিহত ৩

স্টাফ রিপোর্টার
গত বছর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন ২২৯ জন। এ সময় ১৭৫ সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন; এর মধ্যে ৩ জন সাংবাদিক খুন হন। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪৩৯ জন; এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার ১৫৫ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৬২ নারীকে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ‘মানবাধিকার বাংলাদেশ-২০০৯’ শীর্ষক রিপোর্টে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এ রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। রিপোর্টে জানানো হয়, গত ১৪ বছরের তুলনায় ২০০৯ সালে ক্রসফায়ার, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক সহিংসতা, সাংবাদিক ও নারী নির্যাতনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যান্য ঘটনা বেশি ঘটেছে। মত প্রকাশ, সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকার নিরপেক্ষ আচরণ করতে পারেনি। সভা-সমাবেশ দমন করতে গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৬৩ বার ১৪৪ ধারা আইনটি জারি করা হয়। জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১৭৫ সাংবাদিক নির্যাতন, হয়রানি, হামলা ও হুমকির শিকার হন। এ সময়ের মধ্যে নিহত হন কমপক্ষে তিন সাংবাদিক।
গতকাল প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ দুর্নীতি বন্ধ করতে ক্ষমতাসীন সরকার নির্বাচনের আগে যে প্রতিশ্রুতি দেয় এক বছরে তা পূরণ হয়নি। ক্রসফায়ার চলছে নতুন নামে; আর দুদক ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অকার্যকর হয়ে রয়েছে। গতকাল বিকালে ঢাকার রিপোটার্স ইউনিটির কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরী। এতে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী গত বছরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ২২৯ জন। গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ২৯২টি ঘটনায় রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হন প্রায় চার হাজার জন। এতে মারা যান ৩৭ জন। এর মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে ১২টি, নিহত হন একজন। এ সহিংসতার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে বছরজুড়ে দখলদারি এবং মারামারি অব্যাহত ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর আটক বিডিআর সদস্যদের মধ্যে ৫৩ জনের মৃত্যু ঘটে নির্যাতনের কারণে। সরকার পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা অসুস্থতায় মারা গেছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তদন্ত অনুযায়ী মৃত ব্যক্তিদের কেউই রোগাক্রান্ত ছিলেন না। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত পিলখানা হত্যাকাণ্ডকে প্রতিবেদনে ‘গণতন্ত্র ও পুরো জাতির জন্যই বড় হুমকি’ বলে উল্লেখ করা হয়। গতকালের অনুষ্ঠানে বক্তারা পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচারের পাশাপাশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় ও ক্রসফায়ারে মৃত্যুর ঘটনা তদন্তের দাবি জানান। বক্তব্যে তারা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ারও দাবি জানান। প্রতিবেদনে ‘নারীর অধিকার’ সংক্রান্ত উপ-শিরোনামে বলা হয়, ২০০৯ সালে সহিংসতা রোধ করতে আইন প্রণয়ন এবং হাইকোর্টের রায় সত্ত্বেও নারী নির্যাতন কমেনি। ধর্ষণের শিকার হন ৪৩৯ জন। গণধর্ষণের শিকার ১৫৫ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৬২ নারীকে। এসব ঘটনায় মামলা করা হয়েছে ২৩৯টি। ২০০৯ সালে পারিবারিকভাবে নির্যাতনের শিকার হন ২৭৭ জন, যৌতুকের কারণে নির্যাতিত হন ২৭৯ জন। যৌতুকের জন্য হত্যা করা হয় ১৮৯ জনকে। ফতোয়ার ঘটনা ঘটেছে ৩৫টি। অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন ৬৩ নারী।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর পার্বত্য অঞ্চলে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসীদের জমি ও ঘর দখল করে নেয়া হলেও প্রশাসন ছিল নির্বিকার। নারী নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে। ৩১ জুলাই শারীরিক প্রতিবন্ধী ২৪ বছর বয়সী মিনা চাকমা গ্রামীণ ব্যাংক কর্মকর্তা নজরুল হাসানের দ্বারা ধর্ষিত হলেও পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেনি। তবে পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে ২০০৯ সালে সরকারের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ সেখান থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার এবং ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তির জন্য জরিপ শুরুর ঘোষণার প্রশংসা করা হয় প্রতিবেদনে।
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায়কে সরকারের সাফল্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতি এ হত্যাকাণ্ডের বিচার পায় ৩৪ বছর ২ মাস ২৭ দিন পর। এছাড়া ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-০৯’, ‘নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন-০৯’ এবং ‘ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন-০৯’ প্রণয়নও গত বছরের উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক অর্জন। তবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গত বছর নেয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়।
গতকালের অনুষ্ঠানে বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরী বলেন, মানবাধিকার সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত অধিকার। তাতে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারও নেই। মানবাধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। কোনো সভ্য জাতি ক্রসফায়ার সমর্থন করতে পারে না। অবিলম্বে সরকারের ক্রসফায়ার বন্ধ করা উচিত।
সুলতানা কামাল বলেন, সরকারের এক বছরের কর্মকাণ্ড তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে মেলালে আমাদের হতাশ হতে হয়। বক্তব্যে তিনি মানবাধিকার কমিশনকে কার্যকর, প্রতিটি ক্রসফায়ারের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় কার্যকর করাসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ১৯৯৬ সাল থেকে প্রতি বছর শেষে আইন ও সালিশ কেন্দ্র মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনটি ১৪তম। অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন মোর্শেদুল আলম।

আপনার মন্তব্য দিন

You must be logged in to post a comment.