04th Mar 2010
দেশে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন : জেনেভায় উল্টো কথা দীপু মনির
বশীর আহমেদ
বর্তমান সরকারের আমলে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার রেকর্ড হলেও এ ব্যাপারে জেনেভায় মানবাধিকার কাউন্সিলের সভায় সম্পূর্ণ অসত্য বক্তব্য দিয়ে এলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। মানবাধিকার সংস্থা অধিকার এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এবারের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যা অতীতের ১৪ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে। ২০০৯ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছে ২২৯ জন। অথচ গত ১ মার্চ জেনেভায় অনুষ্ঠিত মানবাধিকার কাউন্সিলের উচ্চপর্যায়ের সভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী অসত্য বক্তব্য দিয়ে বলেছেন, বর্তমান সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ বিচারবহির্ভূত কোনো কিছুতেই বিশ্বাস করে না। এই সরকারের আমলে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যা, নারী নির্যাতন রোধ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে মানবাধিকার কাউন্সিলের সভায় যেসব তথ্য দিয়েছেন তার অধিকাংশই অসত্য।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মানবাধিকার কাউন্সিলের উচ্চপর্যায়ের সভায় তার বক্তব্যে বলেছেন, আমরা বাংলাদেশে এমন একটি সমাজ গড়ছি যেখানে সব মানুষ মানবাধিকারসহ নাগরিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক অধিকার পূর্ণ মাত্রায় ভোগ করতে পারে।
বাংলাদেশের নারী অধিকার সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, রাজনীতিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীরা তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেছে। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেনেভায় বলেছেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ যেকোনো ধরনের বিচারবহির্ভূত পন্থা অবলম্বনের সম্পূর্ণ বিরোধী বর্তমান সরকার। কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে এ ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ডের স্থান হতে পারে না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ড একেবারেই সহ্য করা হবে না বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, অতীতে গড়ে ওঠা প্র্যাকটিস আমাদের কাজকে কঠিন করছে। বর্তমান সরকারের আমলে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে বর্তমান সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বর্তমান সরকারের আমলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের ব্যাপারে যে ইতিবাচক ধারা তৈরি হয়েছে তাতে আমরা উত্সাহিত বোধ করছি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে আরও বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মানবাধিকার নিশ্চিত করতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মানবাধিকার বিষয়ে জাতিসংঘের শুনানিতে বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অঙ্গীকার করে এসেছিলেন বাংলাদেশে আর কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হবে না।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এসব বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির কোনো মিল নেই। ২০০৯ সালের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর প্রকাশিত অধিকার এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বার্ষিক প্রতিবেদনে বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন ২২৯ জন। এ সময় ১৭৫ সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩ জন সাংবাদিক খুন হন। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪৩৯ জন। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার ১৫৫ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৬২ নারীকে।
রিপোর্টে বলা হয়, গত ১৪ বছরের তুলনায় ২০০৯ সালে ক্রসফায়ার, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক সহিংসতা, সাংবাদিক ও নারী নির্যাতনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যান্য ঘটনা বেশি ঘটেছে। মত প্রকাশ, সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকার নিরপেক্ষ আচরণ করতে পারেনি। সভা-সমাবেশ দমন করতে গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৬৩ বার ১৪৪ ধারা আইনটি জারি করা হয়। জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১৭৫ সাংবাদিক নির্যাতন, হয়রানি, হামলা ও হুমকির শিকার হন। এ সময়ের মধ্যে নিহত হন কমপক্ষে তিন সাংবাদিক।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ দুর্নীতি বন্ধ করতে ক্ষমতাসীন সরকার নির্বাচনের আগে যে প্রতিশ্রুতি দেয়, এক বছরে তা পূরণ হয়নি। ক্রসফায়ার চলছে নতুন নামে। আর দুদক ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অকার্যকর হয়ে রয়েছে।
গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ২৯২টি ঘটনায় রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হন প্রায় চার হাজার জন। এতে মারা যান ৩৭ জন। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে ১২টি, নিহত হন একজন। এ সহিংসতার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে বছর জুড়ে দখলদারি এবং মারামারি অব্যাহত ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর আটক বিডিআর সদস্যদের মধ্যে ৫৩ জনের মৃত্যু ঘটে নির্যাতনের কারণে। সরকার পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা অসুস্থতায় মারা গেছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তদন্ত অনুযায়ী মৃত ব্যক্তিদের কেউই রোগাক্রান্ত ছিলেন না। প্রতিবেদনে নারীর অধিকার শিরোনামে বলা হয়, ২০০৯ সালে সহিংসতা রোধ করতে আইন প্রণয়ন এবং হাইকোর্টের রায় সত্ত্বেও নারী নির্যাতন কমেনি। ধর্ষণের শিকার হন ৪৩৯ জন। গণধর্ষণের শিকার ১৫৫ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৬২ নারীকে। এসব ঘটনায় মামলা করা হয়েছে ২৩৯টি। ২০০৯ সালে পারিবারিকভাবে নির্যাতনের শিকার হন ২৭৭ জন, যৌতুকের কারণে নির্যাতিত হন ২৭৯ জন। যৌতুকের জন্য হত্যা করা হয় ১৮৯ জনকে। ফতোয়ার ঘটনা ঘটেছে ৩৫টি। এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন ৬৩ নারী। গত বছরের মতো চলতি বছরেও মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। গত মাসে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালিয়েছে সরকার। মাত্র ২-৩ দিনে গ্রেফতার করা হয়েছে ১০ হাজারেরও বেশি বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীকে। সাংবাদিকদের ওপর চলছে হামলা, মামলা ও নির্যাতন। এই সরকারের আমলে ৩ শতাধিক সাংবাদিক নির্যাতিত হয়েছেন। নিহত হয়েছেন ৩ জন।
আপনার মন্তব্য দিন
You must be logged in to post a comment.